A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

মিয়ানমারে চীন বিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে | Probe News

মিয়ানমারে চীন বিরোধী মনোভাব তীব্র হচ্ছে

myanmar 1-7-14প্রোবনিউজ, ডেস্ক: মিয়ানমারে চীন বিরোধী মনোভাবের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ব্যবসা করতে যেয়ে সমস্যায় পড়ছে চীনের কোম্পানিগুলো। প্রায়ই এখন সেখানে চীনের কোম্পানিগুলোর সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে স্থানীয় নাগরিকদের চোরাগোপ্তা হামলায়; ক্রোধের শিকার হচ্ছে পাইপলাইন, গুদামঘর ইত্যাদি। চীনের কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম রক্ষা করতে অনেক স্থানেই মোতায়েন করতে হচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে। আবার দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সক্রিয়তার কারণে অনেক স্থানে চীনের বিনিয়োগ পাহারায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর সাথে সংঘাত বেঁধে যাচ্ছে জাতিগত গেরিলাদের। ফলে নতুন করে বাসস্থান ছাড়া হচ্ছে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ। পাশাপাশি দেশটিতে চীনের বিনিয়োগও ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘ সামরিক শাসনকালে মিয়ানমারের একমাত্র বন্ধু রাষ্ট্র ছিল চীন। চীনের অবকাঠামোগত প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে সেদেশে। অনেক মিয়ানমারবাসীই বলেন চীনাদের বাদ দিয়ে আমরা চলতে পারবো না, কিন্তু আমরা তাদের আর পছন্দ করি না। ফলে এমুহূর্তে মিয়ানমারে বিতর্কিত সব প্রকল্পই কার্যত চীনের প্রকল্প।
চীনের প্রতি মিয়ানমারের নাগরিকদের এই বিরাগের মূলে রয়েছে কোম্পানিগুলোর নির্দয় আচরণ। এসব কোম্পানির অবকাঠামোগত নানান প্রকল্পে মিয়ানমার জুড়ে প্রচুর মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। অনেক সময়ই এসব উদ্বাস্তুদের যথাযথভাবে পুনর্বাসনও করা হয়নি।
উন্নয়নের নামে উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টির এমুহূর্তের সবচেয়ে বড় উদাহরণ চীন-মিয়ানমার শিইউ পাইপলাইন প্রকল্প। চীন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এই প্রকল্পে। ভারত মহাসাগর থেকে মিয়ানমার হয়ে পাইপলাইনে করে তেল যাবে চীনে। ভারতের একটি কোম্পানিও এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন তার জ্বালানি পরিবহনে জাহাজ নির্ভরতা অনেক কমিয়ে ফেলতে পারবে বলে আশা করছে। সমুদ্রে জলদস্যুদের উৎপাতে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে এরূপ পরিবহণ এখন অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে চীনের জন্য।
কিন্তু এই প্রকল্প করতে যেয়ে মিয়ানমারের বাসিন্দাদের প্রচুর জমি ছাড়তে হচ্ছে। ফলে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত প্রকল্প হয়ে উঠেছে চীন-মিয়ানমার শিইউ পাইপলাইন প্রকল্প। এর মধ্যে দিয়ে দেশটিতে সরকারি বাহিনীর সাথে বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বও আবারও প্রকট হচ্ছে।
২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসার পটভূমিতে বিভিন্ন দেশের প্রচুর বিনিয়োগ ঘটছে দেশটিতে। স্বভাবত এক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে চীনই এগিয়ে থাকতে চেয়েছে। দেশটিতে নিজস্ব পণ্যের প্রায় ঢল বইয়ে দিয়েছে চীন। এতে স্থানীয় কোন উৎপাদকই সুবিধা করতে পারছে না। পাশাপাশি চীন সিমান্তে সেদেশের মানুষের অবাধ অনুপ্রবেশও ধীরে ধীরে চীনের মানুষদের প্রতি মিয়ানমারকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। ইতোমধ্যে চীন-মিয়ানমার সীমান্তে জাতিগত চীনা এবং মিয়ানমারের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েক দফা সংর্ঘষের ঘটনাও ঘটেছে।

এইরূপ সংঘাত ১৯৬৭ সালের চীন বিরোধী দাঙ্গার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যখন মিয়ানমারে জাতিগত চীনাদের খুঁজে খুঁজে আক্রমণ করা হয়েছিল। মিয়ানমারের ড্রাগ সা¤্রাজ্যও সীমান্তবর্তী জাতিগত কোয়াঙরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মিয়ানমারে যেকোন জাতিসত্তার চেয়ে কোয়াঙরাই ধনী এটাও তাদের প্রতি অন্যান্যদের ঈর্ষার এক বড় কারণ।

চীন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় কমিউনিটিগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিবর্তে মূলত সামরিক বাহিনীর সহযোগিতার ওপরই জোর দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চীনের প্রতি বিশেষ নির্ভরশীলতা রয়েছে। এই সুযোগ ও প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে চীন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে আর্থিকভাবে কলুষিতও করেছে বলে মনে করে সাধারণ মিয়ানমারবাসী। ফলে চীনকে কেন্দ্র করেই জনগণের সাথে সেনাবাহিনীর দূরত্বও বাড়ছে দেশটিতে। এসবেরই সামগ্রিক ফল হিসেবে কয়েক বছর আগে ইরাবতী নদীতে ড্যাম নির্মাণের চীনা উদ্যোগ পরিত্যাক্ত হয়েছে প্রবল প্রতিবাদের কারণে। ইরাবতীতে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের ‘মাইইস্টোন’ প্রকল্প কাচিনদের চরমভাবে বিক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল। এর ফলে কাচিনদের সাথে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ১৭ বছর পুরানো যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে যায়। সরকার এক পর্যায়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই ড্যাম নির্মাণ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের ‘পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন’ আর কখনোই সেখানে ড্যাম নির্মাণের সুযোগ পাবে বলে মনে হয় না।
এইরূপ ক্ষোভের আরেকটি কারণ হলো ইতিমধ্যে মিয়ানমার জুড়ে চীন যতগুলো জলবিদ্যুত প্রকল্প করেছে তার সবগুলোর বিদ্যুতই চলে যাচ্ছে চীনে। স্থানীয় মানুষ এসব বিনিয়োগ থেকে কোনভাবেই লাভবান হয় নি। ফলে মানুষ এইরূপ বিশাল প্রকল্পের প্রতি শুরু থেকেই এখন বৈরি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে অন্য অনেক ইস্যুর চেয়ে চীন-মিয়ানমার সম্পর্কই অন্যতম প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে উঠবে বলে এখন থেকে তাই অনুমান করা হচ্ছে।
দেশটির নাগরিক সমাজ এই অবস্থায় তাদের চীন নির্ভরতা কমাতে পশ্চিমের কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেয়ার পক্ষে। এভাবে তারা দেশটিতে একটা ভারসাম্য আনতে চান। বিশেষত চীনের কোম্পানিগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেভাবে স্থানীয় পরিবেশের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে থাকে এতে মিয়ানমারে শ্রেণী নির্বিশেষে সবাই ক্ষুব্ধ।
মিয়ানমারের নাগরিক সমাজের এইরূপ মনোভাব থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী এনজিওগুলোও এখন পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে জনমতকে সংঘবদ্ধ করার জন্য বিশেষ উদ্যোগী। বিশেষ করে জলবিদ্যুত প্রকল্প, খনিজ প্রকল্প ইত্যাদি শুরুর পূর্বে তার পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি যাচাইয়ের দাবি তুলেছে তারা। এনজিওদের এইরূপ ভূমিকাও চীনের বিনিয়োগ হ্রাসে অবদান রাখছে।
সম্প্রতি এরূপ একটি এনজিও প্রভাবিত আন্দোলন শুরু হয়েছে মধ্য মিয়ানমারে একটি কপার খনি নিয়ে। চীনের নরিনকো এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি মিলে শুরু হলেও ২০১২ নাগাদ; তা এক দফা বন্ধ করে দিতে হয় স্থানীয় কৃষকদের প্রতিবাদের মুখে। এই প্রকল্প নেয়া হলে যে এসিডবর্জ্য তৈরি হবে তা স্থানীয় কৃষকদের অত্র অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য করতে পারে। এর বিরুদ্ধে যেসব প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে তাতে সেনাবাহিনী ব্যাপক দমনাভিযান চালিয়েছিল। পরবর্তীকালে কোম্পানি প্রকল্প থেকে আয়ের ২ শতাংশ স্থানীয় সমাজের উন্নয়নের ব্যয় করার অঙ্গীকার করার পর এটি আবার চালু হয়। যদিও প্রতিবাদ এখনো চলছে।
তবে পশ্চিমের বিনিয়োগের প্রতি আপাত উৎসাহব্যঞ্জক মনোভাব সত্ত্বেও এখনো জলবিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ খাতে চীন মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী।
চীনের বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় প্রকল্পে স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয় কম এটাও তাদের বিরুদ্ধে এক সাধারণ অভিযোগ। এমনকি চীনের অনেক বড় বড় কোম্পানি মিয়ানমারে বিশাল প্রকল্প পরিচালনা করে কোন ধরনের কার্যালয় না খুলেই।
যেমন, চীনের নর্থ মাইনিং ইনভেস্ট কোম্পানি পশ্চিম মিয়ানমারে নিকেলের একটি খনিতে ৪৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কাজে হাত দিয়েছে, অথচ এখানে তাদের কোন কার্যালয় নেই। কেবল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্তাব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করাই তাদের ব্যবসার মূল কৌশল। মিয়ানমারে দশকের পর দশক ধরে চীন এভাবেই ব্যবসা করেছে।
চীন ও মিয়ানমারের জন্য যোগাযোগের মূল সড়ক গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে নির্মিত বার্মা রোড। মূলত জাপানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইরত চীনের জাতীয়তাবাদীদের প্রয়োজনেই এই সড়কটি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে গত আশির দশকে মিয়ানমার যখন পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়ে তখন আবার এই সড়ক মিয়ানমারের জন্য অক্সিজেনের ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে আবার এই সড়ক মিয়ানমারের অর্থনীতির জন্য মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। বার্মারোড ধরে চীনের সস্তা পণ্যের অবাধ আমদানি মিয়ানমারের শিল্পভিতকে দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। ফলে কৃষি সভ্যতা থেকে দেশটির শিল্প সভ্যতায় অভিষেকও থমকে আছে চীনের জন্যই।
মিয়ানমারের যেকোন শহরের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম তাই মূলত চীনের পণ্যসামগ্রীর ব্যবসা। উত্তরের মান্দালের কথাই ধরা যাক। এ শহরে পণ্য চলাচল, আর্থিক গতিশীলতা এবং চীনের নাগরিকদের সদম্ভ চলাচল যেকোন ভ্রমণকারীকেই দেশটির উপর চীনের আধিপত্যকে মূহূর্তেই স্পষ্ট করে তুলবে। এরকম শহরগুলোতে এখন জমির উচ্চমূল্য, আবাসন খরচের আধিক্য স্থানীয়দের ক্রমে শহর ছেড়ে শহরতলিতে ঠেলে দিচ্ছে। নি¤œমধ্যবিত্তরাও তাই তাদের দেশে চীনের আধিপত্যে অসন্তুষ্ট।
প্রোব/ আপা/দক্ষিণএশিয়া/ ০১.০৭.২০১৪

 

 

১ জুলাই ২০১৪ | জাতীয় | ১৩:২৭:২৭ | ১১:৩৩:২৯

জাতীয়

 >  Last ›