A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

‘বিহারী ক্যাম্প’-এ যেভাবে ‘মানুষ’ বেঁচে আছে | Probe News

 ‘বিহারী ক্যাম্প’-এ যেভাবে ‘মানুষ’ বেঁচে আছে

আলতাফ পারভেজ

 

Bihari 4.JPG


জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ নামে বিখ্যাত কবিতাটি অনেকেরই পড়া। প্রথম লাইনগুলো এরকম:

এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি;
সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়...
চারিপাশে বনের বিস্ময়, চৈত্রের বাতাস,
জ্যোৎস্নার শরীরের স্বাদ যেন!...

ঢাকার নাগরিক যে ক্যাম্পের কথা বলতে যেয়ে জীবনানন্দের ক্যাম্পে’র কথা মনে পড়লো সেখানে দখিনা বাতাস কিংবা জ্যোৎস্নার দেখা মেলা দুঃসাধ্য। মোহাম্মদপুর, মিরপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’গুলোর কথা বলছি। সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে যাদের আগ্রহ; যারা সাংবাদিক, শিল্পী, এনজিও কর্মী, সর্বপরি অনুসন্ধানী মানুষ তাদের সবারই এই ক্যাম্পগুলো সরেজমিনে দেখা উচিত। সেখানে ঘোরা উচিত। সেখানকার মানুষদের সাথে কথা বলা উচিত। শুধু যে কালশি গণহত্যার কারণ অনুসন্ধানের জন্য যেতে হবে- তাই নয়। নিজেদের উদাসীনতার ব্যক্তিগত পরিধি এবং রাজনৈতিক জিঘাংসার উপমহাদেশীয় ঐতিহাসিক কাঠামো বোঝার স্বার্থেও আমরা সবাই জেনেভা ক্যাম্পগুলোতে যেতে পারি।

Bihari -2.jpg২০১৪ সালে এসেও নগর সভ্যতায় মানুষ যে কী দুর্বিষহ, অকল্পনীয় অমানবিকতার মাঝে জীবন যাপন করতে পারে এর সঙ্গে তুলনাযোগ্য আর দ্বিতীয় কোনো নজির বাংলাদেশে আপতত পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ১৬ কোটি স্বাভাবিক স্বাধীন জীবনাচারের মাঝে এরকম গুচ্ছ গুচ্ছ অমানবিকতার ক্যাম্প লালন করার মাঝে বহু ধরনের সমাজতাত্ত্বিক ও মনোজাগতিক বার্তা আছে। বুদ্ধিমান অনুসন্ধানকারী মাত্রই সেসব বার্তার তাৎপর্য বুঝতে পারবেন। বিশেষত. কালশি হত্যালীলার কারণ অনুসন্ধানে যারা ১৪ জুনেরও আগের ইতিহাস খুঁজতে চান।

দেশজুড়ে ‘বিহারী’ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এরকম ক্যাম্প আছে ৭০টি। ১৯৭২ থেকে এই মানুষরা ক্যাম্পবদ্ধ। প্রায় তিন লাখ উর্দুবাসী ‘শরণার্থী’ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে এসব ক্যাম্পে। রাজধানীর বাইরের আগ্রহীরাও তাদের আশে পাশের ক্যাম্পে ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন। এ বিষয়ে মননশীল ক্ষুধা নিবৃত্তির সুযোগ রয়েছে পুরো বাংলাদেশেই।

এ লেখায় বারবার ‘বিহারী’ সম্বোধন করা হচ্ছে কারণ বাংলাদেশ যে এই ক্যাম্পবাসীদের এখনও ‘মানুষ’ মনে করে না তা বহুভাবে স্পষ্ট। নইলে এভাবে তাদের রাখা হতো না; এভাবে তাদের থাকতে হতো না। এভাবে আগুনে পুড়ে, গুলিBihari- 1.jpg খেয়ে তাদের মরতে হতো না- যেমন হলো সদ্য বিগত লায়লাতুল বরাতের রাতে।

বাংলাদেশের বাঙ্গালি মনস্তত্বের জন্য মুশকিলের দিক হলো ‘বিহারী’ পরিবারের শিশুগুলোও মানুষ; গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে ‘জেনেভা ক্যাম্প’গুলোতে যেসব শিশু জন্ম নিয়ে চলেছে তারা যখন প্রশ্ন করে, আমরা কেন এই রাষ্ট্রের বরাদ্দকৃত ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাটুকুও পাবো না, তখন উত্তর দেয়া কঠিন বৈকি। উপমহাদেশের ইতিহাস এবং তার বিবিধ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই শিশুদের মোকাবেলা করতে তখন প্রকৃতই ব্যর্থ। তাদের বাসস্থানের নামের সাথে কীভাবে সুইৎজারল্যান্ডের রাজধানীর নাম এসে যুক্ত হলো সেও বহু ব্যাখ্যা করেই তাদের বোঝাতে হয়।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে আজকের উর্দুভাষী শিশুদের পূর্বপুরুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়ক মিলিশিয়া ছিল। ঐতিহাসিক সেই অপরাধের বিচার করতে পারিনি আমরা।
বিহারীদেরও একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে এবং ১৬ ডিসেম্বরের পরে নিজস্ব নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বিস্তর মাশুল দিতে হয়েছে। বগুড়ার শান্তাহারে কিংবা ঢাকার মিরপুরে ঐ সময় যা ঘটেছে সেগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য সুখকর নয়। একদিন অবশ্যই বাংলাদেশকে সেই আর্কাইভের সামনে দাঁড়াতে হবে।পাশাপাশি যুদ্ধে জিতেও পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে ব্যর্থ বাংলাদেশ সরকার। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যে কোনোভাবেই বাংলাদেশস্থ ‘বিহারী’দের প্রতি তার নৈতিক দায় এড়াতে পারে না সে সত্য বিশ্ব পরিসরে তুলে ধরার দায় থেকে কবে যে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেহাই পেল তাও বোঝা মুশকিল। এমনকি পাকিস্তানের কাছে আমাদের সম্পদগত যে পাওনা ছিল সেটা আদায়ের প্রসঙ্গও আজ আর শোনা যায় না।

একাত্তরের যুদ্ধের পর পর তৎকালীন সরকার চার বিলিয়ন ডলার সমমানের সম্পদগত হিস্যার দাবি তুলেছিল। তাছাড়া, সত্তরের সাইক্লোনে পূর্ব-বাংলার Bihari 3.JPGমানুষের জন্য বিশ্ব সমাজ পাকিস্তানকে যে দুই শত মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল সেটাও আমরা পাইনি। আমাদের সাম্প্রতিক সরকারগুলো এসব বিষয়ে কী বিবেচনায় উদাসীন হয়ে গেল তা বোধগম্য নয়। প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক এতসব ব্যর্থতার দায় আড়াল করতেই বোধ হয় ‘ক্যাম্প’গুলো লালন করা হচ্ছে এ দেশে। পাকিস্তানের সঙ্গে বোঝাপড়াগত সকল ব্যর্থতার দায় বইবে আজ ও আগামী দিনের বিহারী শিশুরা! যেভাবে ভারত-পাকিস্তানের নানা দরকষাকষির দায় বইছে কাশ্মীরী নিষ্পাপ তারুণ্য।

কমিউনিটিগতভাবে বিহারীরাও হয়তো এইরূপ ভবিষ্যত আগেই আন্দাজ করে থাকবেন। যেকারণে মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী বাঙ্গালিদের ঘৃণা ও আক্রমণের মুখে ১৯৭২ সালে প্রায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার বিহারী পশ্চিম পাকিস্তান চলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। ১৯৮২ সালে দিকে প্রায় সোয়া লাখ চলেও গিয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠই ইতিহাস ও নিয়তির হাতে আজো বন্দি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাড়া খেয়ে আসা পাকিস্তান গমনে ইচ্ছুক এই বিহারীদের সাময়িক অবস্থানের জন্য (সর্বোচ্চ তিন বছর) আলোচিত ক্যাম্পগুলো নির্মিত হয়েছিল ১৯৭২-এ।

ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে ৪২ বছর। অনেক বড় সময় বৈকি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে যেয়ে দেখেছি, ৪০.১১ বিঘার উপর ৫ হাজার ৫০০ পরিবার থাকছে। বিস্ময়কর ঘনত্ব। এই বিশাল সংখ্যার শরণার্থীরা প্রতিদিন যে ময়লা পয়দা করে সেটাও সিটি কর্পোরেশন সরায় না। কারণ এরা যে এখনো ক্যাম্পের বাসিন্দা, ‘শরণার্থী’। এই শরণার্থীদের আবার সরকার ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে রেখেছে।12342_576758572437156_8004620452571865247_n.jpg শরণার্থী হলেও ক্ষমতার সমীকরণে এদের পাঁচ বছর পর পর ভোট কেন্দ্রে নিয়ে অনেকে লাভবান হন। আবার ভোটার আইডি কার্ড দেয়া হলেও সেই কার্ড দিয়ে আশেপাশের ‘বাঙ্গালি সমাজ’ যেসব নাগরিক সুবিধার দাবি করতে পারেন ক্যাম্পবাসী তা পারে না। সেক্ষেত্রে ‘সরকারি অনুমোদন’ নেই। বিশেষ করে পাসপোর্ট পাচ্ছে না উর্দুভাষীরা।

দেশের বহু নির্বাচনী এলাকায় বিহারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক এখন। কিন্তু জাতীয় সংসদে তাদের ভোটে নির্বাচিত কোনো ‘জনপ্রতিনিধি’ কখনো ক্যাম্প জীবনের দুর্দশা নিয়ে কথা বলেছেন বলে শোনা যায় না। অর্থাৎ বিহারীদের ঘিরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নীতি-কৌশলের সবকিছুই স্ববিরোধিতায় ভরা। চূড়ান্ত সত্য কেবল এটুকুই, আট ফুট বাই আট ফুটের মাঝে বিয়াল্লিশ বছর ধরে প্রতিটি পরিবার থাকছে সেখানে। ইতিমধ্যে এই চৌহদ্দিতে তিন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। একই কক্ষে পিতা-মাতার পাশেই ঘুমাতে হচ্ছে ছেলে ও ছেলের বৌকে। কখনো কখনো মেয়ে ও মেয়ের জামাইকেও। প্রকৃতই অসম্ভব এক জীবন যাপন। ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ারও জো নেই। কারণ উর্দুবাসী কাউকে স্বাভাবিক প্রতিবেশি হিসেবে মেনে নিতে এখনও অভ্যস্ত হয়নি একুশে চেতনায় স্নাত বাঙ্গালি সমাজ। যে কারণে বাঙ্গালি সামজে আজো ‘মুহাজির’ ‘নন-বেঙ্গলি’ ‘রেফুইজি’ ‘মাড়ুয়া’ ইত্যাদি বহু নামে ডাকা হয় ক্যাম্পবাসী শরণার্থীদের। এসব সম্বোধনের কোনো কোনোটি তীব্র জাতীয়তাবাদী ঘৃণারই প্রকাশ। যে ঘৃণার মুখোমুখী হতে হয় ক্যাম্পবাসী শিশুদের আশেপাশের স্কুলেও। একসময় হতোদ্যম হয়ে শিক্ষার পাঠ ছেড়ে দেয় ঐ শিশুরা। তাতে অবশ্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য’ বাধাগ্রস্ত হয় না- কারণ এরা তো আর বাঙ্গালি শিশু নয়! ক্যাম্পবাসী অনেক মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। বাঙ্গালিরা বোধগম্য কারণেই তাদের বিয়ে করতে অনিচ্ছুক। কিন্তু বিহারী ছেলেরাও অনাগ্রহী এ কারণে যে, বৌকে নিয়ে থাকবে কোথায়? রাজনীতি ও ইতিহাস এভাবেই বোধহয় দাম্পত্য সম্পর্কেও ঢুকে পড়ে।

এই লেখার শুরুতে জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্প’ কবিতার উল্লেখ করা হয়েছে। কবিতাটি লেখার পর কবিকে তীব্র সামাজিক বৈরিতার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার মতো বিপদজনক পরিস্থিতিতেও পড়েছিলেন তিনি। তৎকালীন সমাজে ক্যাম্পকে শনাক্ত করা হয়েছিল ‘অশ্লীলতার ডিপো’ হিসেবে। আমাদের ‘জেনেভা ক্যাম্প’ বা ‘বিহারী ক্যাম্প’গুলো প্রকৃতই ‘অশ্লীলতার ডিপো’। জগতের সকল অসভ্যতা, উদাসীনতা, দারিদ্র্য যেন সেখানে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ক্যাম্পের প্রতি ইঞ্চিতে। ঐতিহাসিক ঘৃণাকে যে অশ্লীলতার আদলে চাপিয়ে দেয়া যায় তার মনেযোগ আকর্ষণী এক নজির দেশের বিহারী ক্যাম্পগুলো। যুদ্ধের পরও সমাজে কীভাবে জিঘাংসা জারি থাকে সেটা দেখার জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল সমাজ বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে প্রতিটি ক্যাম্প। মিরপুর, বনানী, উত্তরার মাঝখানে দারিদ্র্যের এরকম অশ্লীল ডিপো থাকবে কেন? সুতরাং আতশবাজির আড়ালে, পত্র-পত্রিকা বন্ধ থাকবে এমন রাতেই এদের ঘরে আগুন দেয়া ভালো।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের মার্চে একটি খবর বেরিয়েছিল যে, মোহাম্মদপুর এলাকার ক্যাম্পগুলো ভেঙ্গে বিহারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ৪৫টি সু-উচ্চ ভবন নির্মাণ করা হবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগ সম্পর্কে এর পর থেকে আর সামান্যতম অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানা যায় না। ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে স্বাভাবিক নাগরিক জীবন যাপনের কোনো উদ্যোগ বা অন্যত্র বিহারীদের ‘মানুষের মতো’ করে পুনর্বাসনের কোনো আয়োজন নিয়ে বহু অনুসন্ধানের পরও কোনো সংবাদ দিতে পারেননি সরকারি বেসরকারি কেউই।

অন্যদিকে, ক্যাম্পে বসবাস করলেও ২০০৩ সাল থেকে এই জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত রেশন ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছে। যতদূর জানা যায়, ঊনসত্তরের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে তার নির্বাচনী মেনিফেস্টো ছেপেছিল এবং ‘উর্দুভাষীদের এখানেই ভালোভাবে পুনর্বাসনে’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে বাঙ্গালির রাজনীতি যে কেবল নিজেকেই ‘পুনর্বাসন’ করতে চায়- সে পথে লাশ দশটি পড়ুক, আর এক শত পড়ুক! ১৯৪৭-এ আমরা হিন্দুদের ঘরে আগুন দিয়ে নিজেদের ‘পুনর্বাসন’ করেছি। একাত্তরে করেছি উর্দুভাষীদের ঘরে আগুন দিয়ে। ২০১৪-এর জুন অধ্যায় আমাদের সেই ঐতিহাসিক পুনর্বাসনপর্বেরই আরেক অধ্যায় মাত্র। এর আবার বিচার কী !

১৫ জুন ২০১৪ | জাতীয় | ২০:০১:২৪ | ১৭:৪৩:৩১

জাতীয়

 >  Last ›