A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

ছয় বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১২২ শতাংশ; দাম বাড়ানো হয়েছে ৬৪ শতাংশ অবাস্তব আশাবাদ এবং অসত্য সন্তুষ্টির চোরাগলিতে জ্বালানী খাত কুইক রেন্টাল নির্ | Probe News

অবাস্তব আশাবাদের চোরাগলিতে জ্বালানী খাত

ছয় বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১২২ শতাংশ
দাম বাড়ানো হয়েছে ৬৪ শতাংশ
কুইক রেন্টাল নির্ভরতা বাড়ছেই

 

_61931089_indiapower_ap.jpgআলতাফ পারভেজ, প্রোবনিউজ, ঢাকা: ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন বাংলাদেশে লোডশেডিং নেই; বর্তমানে সরকারের বিদ্যুত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১০ হাজার ৩৪১ মেগাওয়াট ২০১৭ সাল নাগাদ যে সক্ষমতা ১৮ হাজার ১৬২ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। অর্থমন্ত্রী এও বলেছেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এরূপ দাবি ও আশাবাদের যথার্থতা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ তৈরি হয়েছে কারণ বাস্তব তথ্য-উপাত্তের সাথে এইরূপ দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উপরন্তু, এসব দাবি ও আশাবাদের অভ্যন্তরে বিপদজনক নানান তথ্য-উপাত্ত ধামাচাপা পড়েছে।


অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবারের মূল বাজেট বক্তৃতায় জ্বালানি ও বিদ্যুত খাতের জন্য ১১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি ‘জ্বালানী খাতের উন্নয়ন: সাফল্যের অগ্রযাত্রা’ নামে পৃথক একটি প্রতিবেদনও পেশ করেছেন, যা প্রশ্ন সাপেক্ষ সব আশাবাদে ভরপুর। বাস্তবে বাজেট বরাদ্দ থেকেই স্পষ্ট যে, জ্বালানী বা বিদ্যুত এখন আর সরকারের অগ্রাধিকার তালিকাতেও নেই। বাজেট বরাদ্দে এই খাত পেয়েছে ৪. ৬ শতাংশ। যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, জনপ্রশাসন, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি সকল খাতের চেয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুত খাতে বরাদ্দ কম।

উৎপাদন পরিস্থিতি সংক্রান্ত বাস্তব তথ্য
পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে বিদ্যুত উৎপাদন সংক্রান্ত প্রায় ৭৫টি চুক্তি হয়েছে। যার মধ্যে ৩২টি সরকারি খাতে এবং ৪৩টি বেসরকারি খাতে। এসব চুক্তিবদ্ধ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে ১০ হাজার ৮৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়ার কথা। কিন্তু কার্যত সরকারি- বেসরকারি খাত মিলে পাওয়া গেছে প্রায় ৩ হাজার ৪ শত মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের হিস্যা প্রায় অর্ধেক। আর বেসরকারি খাতে উৎপাদিত বিদ্যুতের অনেকখানিই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে ক্রয় করছে পিডিবি অতি উচ্চমূল্যে। কেবল ২০১২-১৩ অর্থ বছরে কুইক রেন্টাল কোম্পানিগুলোকে পিডিবি বিদ্যুত বাবদ এক হাজার ২৪ কোটি ইউনিটের বিপরীতে দিয়েছে ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

পিডিবি সূত্রে জানা যায়, সরকারি খাতের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ২০০৭-০৮ থেকে ২০১২-১৩ পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদন বেড়েছে ২৭২ কোটি ইউনিট। আর কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো বাড়িয়েছে এক হাজার কোটি ইউনিটেরও বেশি। অর্থাৎ সরকারের বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধির দাবির মূল অংশই এসেছে কুইক রেন্টাল থেকে যেটাকে একসময় সাময়িক সমাধান হিসেবে ধরা হয়েছিল এবং যেটাকে এখন স্থায়ী সমাধানে পরিণত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর এইরূপ প্রবণতার খেসারত হিসেবে বিদ্যুতের দাম ক্রমে বাড়িয়ে চলেছে সরকার।

মূল্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্য
২০০৭ সালের মার্চে দেশে বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি মূল্য ছিল ৩.৭৬ টাকা। আর সর্বশেষ এটা করা হয়েছে ৬.১৫ টাকা। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন এই মূল্য আরও বাড়ানো হতে পারে। উল্লেখ্য, কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুত পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের বিপরীতে পিডিবির খরচ প্রায় ১১ টাকা। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে বিদ্যুত পাওয়ার ক্ষেত্রে খরচ পড়েছে প্রতি ইউনিট ৩.২৪ টাকা।

উল্লেখ্য, বিগত শাসনামলে সরকার যে কেবল বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে তাই নয়- ফার্নেস, ডিজেল ও কেরোসিনেরও দাম বাড়িয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ২০১১ এবং ২০১৩ এর মাঝে পাঁচ দফায় বাড়ানো হয়েছে অন্তত ৫৫ ভাগ।

জ্বালানীর এরূপ মূল্যবৃদ্ধি কেবল যে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে তাই নয় এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বহু নি¤œবিত্ত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।

মূল্যবৃদ্ধির পরও লোকসান: নেই কোন জবাবদিহিতা
দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির পরও বিদ্যুতখাতের ব্যর্থতার জন্য সরকারের ভেতর কাউকে জবাবদিহিতা করতে হয় না। পিডিবি সূত্রে জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান ছিল ৬ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। পরের বছর ৫ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ তে লোকসান ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা এবং আসন্ন বছরে লোকসান ধরে রাখা হয়েছে সাত হাজার কোটি টাকা। যেহেতু আগামী দু’ বছরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদনের কোন সম্ভাবনা নেই সে কারণে বিদ্যুত উৎপাদন বর্তমানের মতোই তেল নির্ভর থাকবে এবং সরকারকে এখাতে হয় ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে, অথবা ক্রমাগত দাম বাড়াতে হবে।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল সংক্রান্ত তথ্য
অর্থমন্ত্রীর জ্বালানী ও বিদ্যুত সংক্রান্ত সর্বশেষ আশাবাদের উদ্বেগজনক দিক হলো, এটা ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার উপর জাতীয় নির্ভরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলেই নিশ্চিত অনুমান করা হচ্ছে। এইরূপ নির্ভরতা ২০০৭ সালে সাময়িকভাবে শুরু হলেও বর্তমানে তা প্রায় স্থায়ী রূপ পেয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য এক গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুত উৎপাদনে কুইক রেন্টালের হিস্যা ছিল দশমিক ১৮ শতাংশ। আর ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সেটা দাড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

সর্বশেষ ২০১৩ অর্থবছরে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে সরকার ১ হাজার ২৪ কোটি ইউনিট (কিলোওয়াট/ঘন্টা) বিদ্যুত কিনেছে এবং এটা হলো সরকারের ‘বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি’র দাবির প্রায় ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিদ্যুতে অগ্রগতি ঘটছে কেবল কুইক রেন্টাল পরিমন্ডলে।

অতি উচ্চমূল্যের এই বিদ্যুতের কারণেই গত ছয় বছরে এই খাতে খরচ বেড়েছে ১২২ শতাংশ। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে পিডিবি’র বিদ্যুত উৎপাদন খরচ ছিল ইউনিট প্রতি ২.৭৭ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.১৫ টাকা। যেহেতু এইরূপ উৎপাদন খরচবৃদ্ধির দায় তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তাদের উপর বর্তানো হয় তাই সরকারের বিদ্যুত উৎপাদনের কথিত ‘সাফল্য’ সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। বর্তমান সরকারের শাসনামলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ।

ভবিষ্যত উদ্বেগজনক
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী পাঁচ বছরের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ার দাবি করলেও পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তিকৃত অন্তত ২৩টি বড় বিদ্যুত কেন্দ্রের উৎপাদনে আশানুরূপ অগ্রগতি ঘটেনি। এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫ শত মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়ার সম্ভাবনা ধরে চুক্তি করা হলেও উদ্যোক্তরা এগুলো স্থাপনের সম্ভাব্য তারিখ বারংবার পিছিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের এরূপ পশ্চাৎপসারণের মূল কারণ হলো তারা বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের মতো অর্থের সংস্থান করতে পারেননি। ২০১৪ সালের মধ্যে এরূপ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৭টি উৎপাদনে যাবে বলে সম্ভাবনা রয়েছে, যারা প্রায় ৭ শত মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বর্তমানে ৩৩টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সামর্থ্য হলো প্রায় ২ হাজার ২০০ শত মেগাওয়াট।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের সামগ্রিক এই বাস্তবতায় সরকারের পক্ষে আগামী তিন বছরের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদন ১৮ হাজার মেগাওয়াট এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস অধরা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

সোলার পাওয়ার সংক্রান্ত তথ্য
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এও বলেছেন, ২০১৫ সাল নাগাদ ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবস্থা’ হতে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বহু বছরের বাজেট সহায়তা সত্ত্বেও এ খাতে এখন পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদন ৪০০ মেগাওয়াটের নিচে মোট বিদ্যুত উৎপাদনে যার হিস্যা মাত্র ৩.৪৮ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানী খাতের মূল উপ-খাত সোলার এনার্জিতে বিগত দিনগুলোতে সাফল্য খুবই প্রশ্নবোধক। কারণ সোলার ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুত এখনো দেড় শত মেগাওয়াটও নয়। উপরন্তু এই বিদ্যুত গ্রামীণ ব্যবহারকারীদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতি ইউনিট গড়ে প্রায় এক শত টাকা মূল্য পড়ে যাচ্ছে। এরূপ বিদ্যুত গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য মোটেই বিনিয়োগ বান্ধব নয়।

গ্যাস সংক্রান্ত তথ্য
বাংলাদেশের জ্বালানী খাতে গ্যাস এখনো প্রাণভোমরার মতো। অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, ২০১৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালিত গ্যাসের পরিমাণ হবে ৩ শত কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। কিন্তু এটা করতে হলে কেবল আগামী বছরই উত্তোলন ৭০ কোটি ঘনফুট বাড়াতে হবে। অথচ সরকারের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ীই এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি দৈনিক ৫০ কোটি ঘণফুট। আপাতত এই ঘাটতি কমে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। ফলে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য বাড়তি গ্যাসেরও কোন সম্ভাবনা নেই।

তীব্র প্রচারণায় ভুল পরিকল্পনা আড়াল করা যাচ্ছে না
সরকারের যেসব মন্ত্রণালয় প্রচারণার পরিসরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় তার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি খাত। কিন্তু হামেশা সত্য-মিথ্যার মিশেল সত্ত্বেও এক্ষেত্রে চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান ক্রমে এত বাড়ছে যে বাস্তবতাকে জনগণের কাছ থেকে আড়াল করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। বিশেষত ২০০৭-এর গ্রীষ্ম থেকে বিদ্যুত সংকট বিশেষ তীব্রতা পেয়েছে।

দেশে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির জন্য বিদ্যুত অপরিহার্য এক উপাদান সত্ত্বেও ভুল পরিকল্পিনা ও জবাবদিহিতা না থাকায় এ খাত এখন অবাস্তব আশাবাদ এবং অসত্য সন্তুষ্টির চোরাগলিতে আটকা পড়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছে; আর এ সময় চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান থাকে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট। সরকারের বর্তমান উৎপাদন সামর্থ্য গড়ে ৬-৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে।

সাধারণভাবে নগরায়নের সাথে বিদ্যুত চাহিদা বৃদ্ধির বিশেষ যোগ রয়েছে। আর সরকার সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদারতার সাথে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেও সেক্ষেত্রে সফলতায় বিশাল সংশয় সৃষ্টি করে রেখেছে বিদ্যুতের অব্যাহত ঘাটতি।

প্রোব/জাতীয়/আপা/০৬.০৬.২০১৪

 

৬ জুন ২০১৪ | জাতীয় | ১২:০৫:২৮ | ১০:৫২:৫৮

জাতীয়

 >  Last ›