A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি জনযুদ্ধের বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার পাঠ | Probe News

robi

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

জনযুদ্ধের বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার পাঠ

বাধন অধিকারী, প্রোবনিউজ: সুমহান জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশে; রবীন্দ্রনাথকে আমরা উপায় ও উপজীব্য দুই-ই করে তুলেছিলাম। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাসনা যা-ই থাকুক না কেন, একাত্তরে সাধারণ মানুষেরা সোজা অর্থে জনযুদ্ধের অংশীদার হয়েছিলো এমন এক বাংলাদেশের জন্য; যেখানে সম্প্রদায় বিভাজনের উপায় হবে না। আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একত্রে বাস করতে পারবে। এইযে চৈতন্য, একে মূর্ত করা হয়েছিলো অমুসলিম রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে। এখানে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ আর তার সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে আমরা আমাদের রাজনৈতিকতার মাঝে স্থাপন করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের গান এভাবেই আমাদের জনযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়বার লক্ষ্যের সমান্তরালে সুর তুলে গেছে। এই দিকটি ধরিয়ে দিয়েছেন চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার। সেকারণেই তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষীরা রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করেন রক্তের দাগ মুছতে মুছতে, জনযুদ্ধের স্মৃতিকে মনে রেখে। “রক্তের দাগমুছে রবীন্দ্রপাঠ” নামে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে (আজকের কাগজে কলাম হিসেবে ছাপা হয়েছিলো লেখাগুলো) তিনি আমাদের আরও জানিয়েছেন, আমাদের “বাংলাদেশ” বানানটাও রবীন্দ্রনাথের। ব্যাপারটা খুব মজার। রবীন্দ্রনাথ কবিতায় “বাংলাদেশ” শব্দটি ব্যবহার করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। আগে আমাদের দেশটার নামের বানান "বাঙ্গলাদেশ" লেখা হতো। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ পড়েছিলেন ছন্দজনিত-জনিত সমস্যায়। আর সেটা মেটাতেই তিনি অনুস্বার (বাংলাদেশ) ব্যবহার করে মাত্রার হেরফের ঘোচাতে চেয়েছিলেন।

তবে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে আমাদের জনযুদ্ধের উপজীব্য হতে পারেন? একাত্তরের জনযুদ্ধের বাসনার মধ্যে, তার রূপরেখার মধ্যে, তার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কী এমন ছিলো, যা আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে পেতে পারি? রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসচেতনা, আত্মপরিচয়ের হিন্দুত্ব আর রবীন্দ্রনাথের প্রার্থিত ধর্মবোধ দিয়ে আমরা এইসব প্রশ্নেরউত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে তিনি যে হিন্দু, তাতে তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছার হাত নেই বলে মনে করতেন তিনি। চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার রবীন্দ্রনাথের এই হিন্দুত্ববোধে আহত হয়েছেন। তাঁর দাবি, আমরা নিজেকে কী ভাবি তার উপরই নির্ভর করে আমাদের আত্মপরিচয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে হিন্দু ভাবেন, নাকি মুসলমান ভাবেন, নাকি গণতন্ত্রী ভাবেন, নাকি স্বৈরতন্ত্রী ভাবেন- ফরহাদ মজহার বলছেন; সেটাই রবীন্দ্রনাথের পরিচয়।

rabndra 3... কেউ ব্রাহ্ম কি হিন্দু কি মুসলমান সেটাও কেউ চুক্তি করে আসে না। কিন্তু কেউ নিজেকে হিন্দু বা মুসলমান ভাবে কি ভাবে না, নিজেকে হিন্দু বা মুসলমান করে গড়ে তোলে কি তোলে না, নিজের ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের বাইরে নিজের পরিচয় খাড়া করতে চায় কি চায় না- এই সবই হচ্ছে নিজের ব্যাপার, নিজের ইচ্ছাই এখানে কর্তা, বিধাতা নয়। [রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, আগামি প্রকাশন, ঢাকা]

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলছেন, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার তর্ক নেই এতে। কেন বলছেন? বলছেন এই কারণে যে, হিন্দুত্বকে ফরহাদ মজহার যেভাবে পাঠ করছেন, রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব সেই জিনিশই না। রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব, তথা রবীন্দ্রনাথের আত্মপরিচয়, ভারতবর্ষেরসেই ঐতিহাসিকতার পরম্পরা; যে পরম্পরায় রবীন্দ্রনাথ জন্ম নিয়েছিলেন। পাঠক আসুন, দেখে নেই রবীন্দ্রনাথের অবস্থান।

কোনো বিশেষ ধর্মমত ও কোনো বিশেষ আচার কোনো জাতির নিত্য লক্ষণ হইতেই পারে না । হাঁসের পক্ষে জলে সাঁতার যেমন , মানুষের পক্ষে বিশেষ ধর্মমত কখনোই সেরূপ নহে। ধর্মমত জড় পদার্থ নহে — মানুষের বিদ্যাবুদ্ধি অবস্থার সঙ্গে সঙ্গেই তাহার বিকাশ আছে — এইজন্য ধর্ম কোনো জাতির অবিচলিত নিত্য পরিচয় হইতেই পারে না। এইজন্য যদিচ সাধারণত সমস্ত ইংরেজের ধর্ম খৃষ্টান ধর্ম, এবং সেই ধর্মমতের উপরেই তাহার সমাজবিধি প্রধানত প্রতিষ্ঠিত তথাপিএকজন ইংরেজ বৌদ্ধ হইয়া গেলে তাহার যত অসুবিধাই হউক তবু সে ইংরেজই থাকে।

এইযে রবীন্দ্রনাথ "ইংরেজ" শব্দটি ব্যবহার করলেন, এটা কি ধর্মীয়-পরিচয় প্রকাশক শব্দ নাকি জাতিগত? আমাদের খেয়াল না করে উপায় থাকে না, এটা একটা জাতিগত পরিচয়। রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্বও তেমনি, তাঁর নিজের মতো করে জাতিগত পরিচয়ের প্রকাশক। রবীন্দ্রনাথের এই আত্মপরিচয়ের দর্শন আপনি মানতে পারেন, নাও মানতে পারেন, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। তবে একে কোনোভাবেই মজহার কথিত 'ঔপনিবেশিকতার ঔরসে অতীত ইতিহাসের নিত্য লক্ষণ খোঁজা হিন্দু মধ্যবিত্তে'র কাজ বলে মানতে পারি না।

তবে শেষাবধি রবীন্দ্রনাথের গন্তব্য কোথায়? ফরহাদ মজহাররা যেটা খেয়াল করেন না, অথবা করতে চান না, সেটা হলো; রবীন্দ্রনাথ আত্মপরিচয়ের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গান গেয়েছেন বিশ্বজনীনতার। আত্মপরিচয়েয় হিন্দুত্ব আর ভারতবর্ষের ইতিহাস রবীন্দ্রনাথের অবস্থান। তবে রবীন্দ্রনাথের গন্তব্য বিশ্বাভিমুখী। যেখানে ভারতবর্ষ আর হিন্দুত্ব অতিক্রান্ত হয়; সেই জায়গাটাই বিশ্বজনীনতা। সেখানটায় সার্বজনীন মানুষের জয়গান। সেখানটায় মানুষের্ ধর্ম। যাকে তিনি মানুষের ধর্ম বলেছেন, আমি তাকে মানবপ্রকৃতি আকারে পাঠ করেছি। এই মানবপ্রকৃতির কারণেই মানুষ মনে মনে “আপনার মিল পায় এবং মিল চায়, মিল না পেলে সে অকৃতার্থ।” এই মানব প্রকৃতির কারণে মানুষ,বুঝতে পারে, “বহুর মধ্যে সে এক; জানে, তার নিজের মনের জানাকে বিশ্বমানবমন যাচাই করে, প্রমাণিত করে, তবে তার মূল্য।” এই মানবপ্রকৃতির কারণেই মানুষ দেখতে পায়, “জ্ঞানে কর্মে ভাবে যতই সকলের সঙ্গে সে যুক্ত হয় ততই সে সত্য হয়। যোগের এই পূর্ণতা নিয়েই মানুষের সভ্যতা।”

রবীন্দ্রনাথ যেখানে মানুষের ধর্মের ঠিকানা পেয়েছেন, সেই জায়গাটার নাম “সার্বজনীন মন”। কবি লিখছেন,

তাই মানুষের সেই প্রকাশই শ্রেষ্ঠ যা একান্ত ব্যক্তিগত মনের নয়, যাকে সকল কালের সকল মানুষের মন স্বীকার করতে পারে। ... মানুষ আপন উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিসীমাকে পেরিয়ে বৃহৎ মানুষ হয়ে উঠছে, তার সমস্ত শ্রেষ্ঠ সাধনা এই বৃহৎ মানুষের সাধনা। এই বৃহৎ মানুষ অন্তরের মানুষ। বাইরে আছে নানা দেশের নানা সমাজের নানা জাত, অন্তরে আছে এক মানব।

রবীন্দ্রনাথ আজ নেই। তবে রয়ে গেছে পরম্পরা। দেশে দেশে জাতীয়তা-প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম-বর্ণবাদ আর অর্থনৈতিক অসমতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ। বিশ্বজনীন এক বিশ্বের পথে!

এই এক মানব, কিংবা অখণ্ড মানব-মন যেখানে; “সেখানে জোর তলবের দায় নেই, সেখানে সকলের চেয়ে বড়ো দায়িত্ব স্বাধীন দায়িত্ব; তাকে বলব আদর্শের দায়িত্ব, মনুষ্যত্বের দায়িত্ব।”আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন;

যেখানে আমিকে না-আমির দিকে জানতে বাধা পাই, তাকে অহং-বেড়ায় বিচ্ছিন্ন সীমাবদ্ধ করে দেখি। এক আত্মলোকে সকল আত্মার অভিমুখে আত্মার সত্য; এই সত্যের আদর্শেই বিচার করতে হবে মানুষের সভ্যতা, মানুষের সমস্ত অনুষ্ঠান, তার রাষ্ট্রতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র — এর থেকে যে পরিমাণে সে ভ্রষ্ট সেই পরিমাণে সে বর্বর।

তাহলে রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব বলতে কী দাঁড়ায়? রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব তখন হয়ে দাঁড়ায়, বিশ্বজনীনতায় তার নিজ ধর্ম-সংস্কৃতি থেকে যুক্ত করা উপাদন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে, আর তার আত্মপরিচয়ের হিন্দুত্বে যে বিশ্বজনীন উপাদান আছে, তাকে সাথে করে নিয়ে বিশ্বমাঝে প্রকাশিত হওয়াটাই রবীন্দ্রনাথের দর্শন। সকল আত্মার অভিমুখে তথা, সব মানুষের তথা সার্বজনীন অখণ্ড মানবমনের অভিমুখে নিজের ইতিহাস আর ধর্ম থেকে যুক্ত করা স্বাধীন-সার্বজনীন উপাদানই রবীন্দ্রনাথের ভারত। তার হিন্দুত্ব। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস। তাই তিনি লিখেছেন,

সব মানুষকে নিয়ে; সব মানুষকে অতিক্রম করে, সীমাবদ্ধ কালকে পার হয়ে এক-মানুষ বিরাজিত। সেই মানুষকেই প্রকাশ করতে হবে, শ্রেষ্ঠ স্থান দিতে হবে বলেই মানুষের বাস দেশে। অর্থাৎ, এমন জায়গায় যেখানে প্রত্যেক মানুষের বিস্তার খণ্ড খণ্ড দেশকালপাত্র ছাড়িয়ে — যেখানে মানুষের বিদ্যা, মানুষের সাধনা সত্য হয় সকল কালের সকল মানুষকে নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ আজ নেই। তবে অখণ্ড মানবসত্তার বিশ্বজনীনতার বাসনা কোনোদিন মরে যাবার নয়। সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ। এগিয়ে যাচ্ছি আমরা বাংলা ভাষাভাষীরাও। সেই পথে রবীন্দ্রনাথ আমাদের অনন্য প্রেরণা।

প্রোব/বান/জাতীয় ০৮.০৫.২০১৪

 

৮ মে ২০১৪ | জাতীয় | ১৫:৪৬:৪৮ | ১২:৪৪:০৩

জাতীয়

 >  Last ›