A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

দুনিয়াময় বিচ্ছিন্ন আধুনিক-ব্যক্তিকে শোষণ-মুক্তির কবিতা শুনিয়েছিলেন তিনি | Probe News

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি: কার্ল মার্ক্স

দুনিয়াময় বিচ্ছিন্ন আধুনিক-ব্যক্তিকে শোষণ-মুক্তির কবিতা শুনিয়েছিলেন তিনি

Marx-Engels.jpgবাধন অধিকারী, প্রোবনিউজ: উনবিংশ শতাব্দী। বিশ্বজুড়ে সমাজ চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলেন একজন জার্মান। অতীতের সব দার্শনিক প্রত্যয়ের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি। জানান দেন, ‘দার্শনিকরা বিস্তর বকেছেন এই দুনিয়া নিয়ে। এবারের কাজ সেই দুনিয়াটা বদল করা’। চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলা এই মানুষটির নাম কার্ল মার্ক্স। এবছর ৫ই মে মহান এই দার্শনিক-সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনীতিকের ১৯৬তম জন্মদিন।

উনবিংশ শতাব্দীর ৪০এর দশকে দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়ে এক বাণী। জাতীয়তার গণ্ডী, সাম্প্রদায়িকতার সীমানা, রাষ্ট্রের কাটাতার অতিক্রম করে দুনিয়ার সমস্ত শ্রমজীবীর ঐক্যের আহ্বান নিয়ে আসেন মার্ক্স এবং তার বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস্। দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়ে সেই বাণী: ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। আজও যে বাণী দেশে দেশে লড়াইয়ে-প্রতিরোধে নিজেদের হাতিয়ার করেন শ্রমজীবীরা।

কার্ল মার্ক্স ১৮১৮ সালের ৫ মে তৎকালীন প্রুশিয়া সম্রাজ্যের নিম্ন রাইন প্রদেশের অন্তর্গত ত্রিভস শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি রাইনল্যান্ডের যুবকদের দ্বারা পরিচালিত ‘রাইন অঞ্চলের সংবাদ পত্র’ নামক পত্রিকায় যোগ দেন এবং ১৮৪২ সালে তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। সম্পাদক হিসাবে যোগ দেয়ার পর থেকেই ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে কাগজটির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। এই সময় মার্ক্স অর্থশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তার পাঠ নেওয়া শুরু করেন।

১৮৪৩ সালের শেষের দিকে মার্ক্স প্যারিসে যান। এখান থেকেই তিনি শুরু করেন অপরিসীম দারিদ্র ও ইউরোপীয় শক্তিশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। এই সংগ্রামেcommunist manifesto.jpg তার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ান তার অকৃত্রিম বন্ধু ও সহযোগী ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। এটা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্বের একটি। Deutsch-Französische Jahrbücher-এর পতন হওয়ার পর মার্ক্স প্যারিসের সবচেয়ে প্রগতিশীল জার্মান পত্রিকায় ("লিগ অফ দ্য জাস্ট" নামক গোপনীয় সমাজ এটা প্রকাশ করতো) একটি প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধের বিষয় ছিল "ইহুদি প্রশ্ন" এবং হেগেল। ১৮৪৫ সালে প্রাশিয়ার সরকারের ষড়যন্ত্রে তিনি প্যারিস থেকে পরিবার সমেত বিতাড়িত হন এবং তিনি চলে যেতে বাধ্য হন ব্রাসেলস-এ। ১৮৪৭ সালে মার্ক্স ও এঙ্গেলস কম্যুনিস্ট লিগে যোগ দেন এবং সেই বছরই এঙ্গেলস-এর সহযোগিতায় যৌথভাবে রচনা করেন শ্রমিক শ্রেণীর অমোঘ হাতিয়ার ‘The Communist Manifesto’।

দুনিয়াময় শ্রমজীবীদের ঐক্যের এই আহ্বান আসে কমিউনিস্ট ইশতেহারের মাধ্যমে। উঠে আসে আধুনিক যুগের বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির আখ্যান:

‘বুর্জোয়া শ্রেণি যেখানেই প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতি-শোভন সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। যেসব বিচিত্র সামন্ত বাধনে মানুষ বাধা ছিলো তার স্বভাবসিদ্ধ উর্ধ্বতনের কাছে, তা এরা ছিড়ে ফেলেছে নির্মমভাবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের নগ্ন স্বার্থের বন্ধন, নির্বিকার ‘নগদ দেনাপাওনা’র সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই এরা অবশিষ্ট রাখেনি। আত্মসর্বস্ব হিসাব-নিকাশের ঠাণ্ডা জলে এরা ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্ম-উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছ্বাস, শৌর্যবৃত্তির উৎসাহ ও কূপমণ্ডুক ভাবালুতা। লোকের ব্যক্তিমূল্যকে এরা পরিণত করেছে বিনিময় মূল্যে, অগণিত অনস্বীকার্য সনদবদ্ধ স্বাধীনতার স্থলে এরা এনে খাড়া করেছে ওই একটিমাত্র নির্বিচার স্বাধীনতা- অবাধ বাণিজ্য। এককথায়, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মোহগ্রস্ততার মধ্যে যে শোষণ এতোদিন ঢাকা ছিলো্; তার স্থলে এরা এনেছে নগ্ন, নির্লজ্জ, সাক্ষাৎ, পাশবিক শোষণ।’

এই ইশতেহার পৃথিবীব্যপী যে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়; পৃথিবীর অন্য কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার এতোখানি প্রভাব তৈরী করতে পারেনি। এই ইশতেহারের প্রেরণাতেই ১৮৪৮ সালে ইউরোপ জুড়ে প্রচুর বিপ্লব সংঘটিত হয়। অনেক কিছুই বদলে যায়। মার্ক্সকে বন্দী করা হয় এবং পরবর্তীতে বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কার করা হয়। নানা ঘা্ত প্রতিঘাতের পর প্যারিস তাকে শরণার্থী হিসেবে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, অগত্যা ১৮৪৯ সালের মে মাসে কার্ল মার্ক্স লন্ডনে চলে যান এবং এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৬০-এর দশকের প্রথম দিকে মার্ক্স তিনটি খণ্ড রচনা শেষ করেন। প্রথম খণ্ডের নাম থিওরিস অফ সারপ্লাস ভ্যালু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড মার্ক্সের জীবদ্দশায় পাণ্ডুলিপি পর্যায়েই থেকে যায়। তার মৃত্যুর পর এঙ্গেলস এগুলো সমাপ্ত করেন এবং প্রকাশ করেন ‌‘ডাস ক্যাপিটাল’ নামে। এই রচনা দুনিয়াজুড়ে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার হয়ে ওঠা এবং এর অমোঘতাকে চ্যালেঞ্জ করে বিকল্প অর্থনীতিক প্রস্তাবের পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

জীবনের শেষ দশকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, আগের মত প্রত্যয়ী বুদ্ধবৃত্তিক আন্দোলন পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েন। ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় মার্ক্সের কোন জাতীয়তা তথা দেশ ছিল না, তাকে ১৭ই মার্চ লন্ডনের হাইগেট সেমিটারি-তে সমাহিত করা হয়। তার সমাধি ফলকে প্রথমে লেখা, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন "দুনিয়ার মজদুর এক হও"

মার্ক্স-এঙ্গেলস-এর দর্শনের প্রেরণার কথা বলেই বিশ শতকের বিশের দশকে Das-Kapital.jpgসোভিয়েত ইউনিয়নে সংঘটিত হয় বিপ্লব। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় ‘শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা’। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেরণায় একে একে স্বাধীন হতে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তাদের সংবিধানে যুক্ত হতে থাকে সমাজতন্ত্র। পূর্ব ইউরোপেও জোয়ার নামে সমাজতন্ত্রের। আজ ল্যাটিন আমেরিকা-ব্যপী বিকল্প আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রেরণাও ওই কার্ল মার্ক্স। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই মার্ক্সবাদকে বাতিলের কাতারে মনে করলেও, আজও তিনি প্রাসঙ্গিক আমাদের জন্য। দুনিয়াময় ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার আজ যে বিপুল সঙ্কট; তা নিয়ে সেই উনিশ শতকেই ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন তিনি। আজ আমরা এই ব্যবস্থার মধ্যে যেসব সঙ্কট দেখছি, মার্ক্সের ব্যাখার সঙ্গে তা মিলে যায়!

কার্ল মার্ক্স রাষ্ট্র দখলের কথা বলতেন। বুর্জোয়াদের কাছ থেকে রাষ্ট্রকে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অধিকার করে শ্রমিক শ্রেণীর এক নায়কত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন তিনি। তবে মার্ক্সের সমসাময়িক অরাজপন্থী (অ্যানার্কিস্ট) বিপ্লবীরা মনে করতেন রাষ্ট্র দখল করলে সেখানে কমিউনিস্টদের বসানো হলে তারাও শোষক হয়ে যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন-সহ দুনিয়াব্যাপী এই বাস্তবতা আমরা দেখেছি। জেনেছি, স্ট্যালিন যুগের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের কথা। তবে এসবকিছুর পরও মার্ক্সের প্রাসঙ্গকিতা একটুও কমে না।

মার্ক্স-এর দুর্দান্ত একটা চিন্তার জায়গা ছিলো বিচ্ছিন্নতা। তরুণকালে, যখন তিনি মুক্তিমুখীন প্রতিরোধের বাসনায় উন্মুখ, তখন শ্রম আর শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার বিবরণ হাজির করতে গিয়ে তিনি আমাদের দেখান, ব্যক্তিমালিকানার সমাজ কীভাবে বিচ্ছিন্নতা জারি রাখে। উৎপাদন যন্ত্রে শ্রমিকের আত্মকর্তৃত্বের অনুপস্থিতি কীভাবে মানুষকে প্রথমে তার কাজ এবং কর্মক্ষেত্র হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে আর সেই বিচ্ছিন্নতা ক্রমে ক্রমে কীভাবে শেষপর্যন্ত তাকে তার মানবিক স্বরূপ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

শ্রমদাসত্বের এই বিচ্ছিন্নতার যুগে কার্ল মার্ক্স তাই আজও আমাদের প্রেরণা। সব ধরনের সমাজ-বদলের লড়াইয়ে।

প্রোব/বান/আন্তর্জাতিক ০৫.০৫.২০১৪

 

৫ মে ২০১৪ | আন্তর্জাতিক | ১৫:২০:৫৬ | ১৩:৩০:৩৩

আন্তর্জাতিক

 >  Last ›