A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

মে দিনের উৎসের খোঁজে | Probe News

মে দিনের উৎসের খোঁজে

Ma y Day 2.jpgবাধন অধিকারী, প্রোবনিউজ: অনেকেই জানে না, মে দিবস কেন শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক দিবস আর কেনইবা আমরা দিনটি উদযাপন করি। সবকিছুর সূচনা হয়েছিল এক শতাব্দীকাল আগে, যখন আমেরিকার লেবার ফাউন্ডেশন একটা ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। এই প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছিলো, “১৯৮৬ সালের ১লা মে থেকে দৈনিক শ্রমের সময় আট ঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে।”
নির্দিষ্ট এই তারিখের আগের মাসগুলোতে অল্পদিনের মধ্যেই হাজারে হাজারে শ্রমিক সংগ্রামে যুক্ত হচ্ছিল। দক্ষ-অদক্ষ, নারী-পুরুষ, স্থানীয়-অভিবাসী, সাদা-কালো সমস্ত শ্রমিক একাত্ম হচ্ছিলো।

শিকাগো
শিকাগোতে চার লাখ মানুষের ধর্মঘট হয়। শহরের একটা সংবাদপত্র রিপোর্ট করে কোনো কল-কারখানার লম্বা চিমনি থেকে কোনো ধোয়া বের হয়নি। শিকাগোই ছিলো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। আর এখানে নৈরাজ্যবাদীরাই ছিলো আন্দোলনের অগ্রভাগে। তাদের অসামান্য কর্মকাণ্ডের ফলেই শিকাগো একটা দুর্দান্ত ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারে রূপান্তরিত হয়েছিলো এবং ৮ঘণ্টা শ্রমের আন্দোলনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিলো।
১লা মে ১৮৮৬তে, যেদিন ৮ঘণ্টা শ্রমের দাবির আন্দোলনে আন্দোলিত হচ্ছিল গোটা শিকাগো, সেইদিন McCormick HarvesterCo.-এর অর্ধেক শ্রমিক ধর্মঘটে নেমে পড়ে। ২দিন বাদে ‘lumber shovers’ ইউনিয়নের ৬০০০ সদস্যের একটা গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, এরাও ধর্মঘটে নামে।

শ্রমিকেরা আগস্ট স্পাইস নামের একজন নৈরাজ্যবাদীর বক্তব্য শুনেছিল; কেন্দ্রীয় লেবার ইউনিয়ন যাকে দায়িত্ব দিয়েছিল ঐ সমাবেশটি পরিচালনার। তিনি শ্রমিকদের একত্রিত হবার কথা বলছিলেন, মনিবদের কাছে আত্মসমর্পণ না-করতে বলছিলেন। এমন সময় ধর্মঘট-ভঙ্গকারীরা আস্তে আস্তে McCormick plant থেকে সরে যেতে থাকে।

‘lumber shovers’ ধর্মঘটীরা রাস্তায় নেমে আসে এবং ধর্মঘটভঙ্গকারীদের কারকানায় ফিরে যেতে বাধ্য করে। হঠাৎ করেই ২০০জন পুলিশের অস্ত্রসজ্জিত একটা দল রাস্তায় নেমে আসে এবং কোনরকমের সতর্কবার্তা না-দিয়েই জনসমাবেশে হামলা চালায়। অন্ততপক্ষে একজনকে তারা মেরে ফেলে, মুমূর্ষু বানিয়ে তোলে ৫/৬ জনকে আর অসংখ্য মানষকে আহত করে। বর্বরোচিত শারীরিক সহিংসতার অকথ্য নিষ্ঠুরতা দেখবার পর স্পাইস Arbeiter-Zeitung-এর অফিসে (জার্মানির অভিবাসী শ্রমিকদের নৈরাজ্যবাদী দৈনিক) গিয়ে ঐ দিনের ঘটনা নিয়ে ঐ রাতেই শিকাগোর শ্রমিকদের একটা বৈঠকে ডাকতে একটা বিজ্ঞপ্তি কম্পোজ করেন।

হে মার্কেট স্কোয়ারে স্পাইস এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের অন্য দুজন নৈরাজ্যবাদী আলবার্ট পারসনস ও স্যামুয়েল ফিলডেন-এর পরিচালনায় সেই প্রতিবাদী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

পুলিশের আক্রমণ
ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জনসাধারণ শান্তই ছিল। মেয়র কার্টার হেরিসন, যিনি বৈঠকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন; উপসংহার টানেন এভাবে যে, “ পুলিশের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কোন কারণই চোখে পড়ে না।’’ তিনি পুলিশ ক্যাপ্টেন জন বনফিল্ডকে এ সম্পর্কে জানান এবং সংরক্ষিত সেনাবাহিনি (যা ষ্টেশন হাউসে অপেক্ষা করছিলো) ফেরত পাঠাবার উপদেশ দেন। প্রায় রাত ১০ টার দিকে ফিডেন বৈঠক শেষ করেছিলেন। খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং মাত্র ২০০ জনের মতো মানুষ স্কয়ারে উপস্থিত ছিল। হুট করে ১৮০ জনের এক বিশাল পুলিশের বহর এসে সবাইকে সাথেসাথে রাস্তা খালি করতে বলে। ফিল্ডেন বাধা দিয়ে বলেন , “আমরা সংঘর্ষের পক্ষে নই”।

বোমা
সেইমুহূর্তে পুলিশের বহরে একটা বোমা ছোড়া হয়। এতে এক জন মারা যায়, ৬ জন গুরুতর আহত হয় এবং ৭০ জনেরও বেশি আহত হয়। পুলিশ জনসমাবেশের উপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলি কত জনকে আহত করেছিল আর কত জনের প্রাণ নিয়েছিল তা সঠিকভাবে কখনওই নিরুপিত হয় নি। শিকাগোর উপর এক আতঙ্কের আধিপত্য ছড়িয়ে পরে। সংবাদমাধ্যমগুলো আর পুরোহিতবর্গ এ বলে প্রতিশোধ নেয় যে, বোমা আক্রমণ ছিল সমাজতন্ত্রী আর নৈরাজ্যবাদীদের কাজ। মিটিং হল , ইউনিয়ন অফিস, ছাপাখানা এবং ব্যক্তি বাড়িতে রেইড দেয়া হচ্ছিলো। সকল চেনাজানা সমাজতন্ত্রী ও নৈরাজ্যবাদীদের ধরা হয়েছিল। এমনকি সমাজবাদ বা নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে কিছুই জানেনা এমন অনেককেও গ্রেপ্তার আর নির্যাতন করা হয়েছিল। “আগে রেইড দাও তারপর আইন নিয়ে ভাব” , এই ছিল রাষ্ট্রের এটর্নির জনসম্মুখে বক্তব্য।
বিচার
পরিণামে ৮ জনকে “হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করার জন্য” বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তারা হলেন স্পিস, ফিল্ডেন, পারসন্স, এবং শ্রমিক আন্দোলনে প্রভাবশালী অন্য ৫ জন নৈরাজ্যবাদী - এডলফ ফিসার, জর্জ এঙ্গেল, মাইকেল শোব, লুইস লিং, অস্কার নব। বিচার শুরু হয় ২১ জুন ১৮৮৬ কুক রাজ্যের ফৌজদারি আদালতে। আগেরবারের মত এবার বাক্স থেকে নাম তুলে বিচারক বাছাই করা হয়নি। রাজ্য এটর্নি গ্রিনেল বিচারক বাছাইয়ের জন্য নিজের মনোনীত একজন বিশেষ শেরিফ নিযুক্ত করেন। প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে শেরিফ জনসম্মুখে বলেছিলেন, “আমি এই মামলা নিজে ম্যানেজ করছি, আর আমি জানি কি করতে যাচ্ছি। এই কয়জন তো নিশ্চিত ভাবে ফাঁসিতে ঝুলবে।” কিন্তু এটা প্রমাণ করবার সুযোগ ছিলো না।

প্রতারক বিচারক
বিচারকদের বিচারের ফলাফল ছিল অযৌক্তিক; ব্যবসায়ি ও তাদের কর্মচারী এবং একজন মৃত পুলিশের আত্মীয়ের বানানো। অভিযুক্ত ৮ জনের কারো বিরুদ্ধেই বোমা হামলা চালানোর বা এর সাথে যুক্ত থাকার বা এর আদেশ দেবার কোন প্রমাণ কোর্টে হাজির করা যায় নি। এমনকি এ ৮ জনের মাত্র ৩ জনি শুধু সেদিন হেমার্কেট স্কয়ারে উপস্থিত ছিলেন।
বক্তা যে তার ভাষণে কোন ভয়াবহতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন, তার কোন প্রমাণও আদালতের কাছে ছিল না, এমনকি মেয়র হেরিসন সেদিনের বক্তব্যকে “নিস্প্রাণ” বলেই বর্ণনা করেছিলেন। কোন ভয়াবহতা অবলোকন করা গিয়েছিল, তারও কোন প্রমাণ নেই। আসলে সেদিন পারসন্স তার দুই সন্তানকে নিয়ে সেই বৈঠকে-এ এসেছিলেন।
শাস্তি
৮ জনকে যে তাদের নৈরাজ্যবাদী চেতনার জন্য এবং ট্রেড-ইউনিয়নের কার্যকলাপের জন্য বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল, শুরু থেকেই তা চোখে পড়েছিল। বিচার যেমনি শুরু হয়েছিল তেমনি শেষ হয়ে যায়। এটর্নি বিচারকদের প্রতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য উপস্থাপন করেন এভাবে: “আইন বিচারের কাঠগড়ায়। নৈরাজ্যবাদ বিচারের কাঠগড়ায়। বিচারকদের দ্বারা নির্বাচিত এই মানুষগুলি এখানে নির্দেশিত কারণ তারা নেতা। হাজার হাজার মানুষ এদের অনুসরণ করে। তাই তাদের চেয়ে বড় কোন অপরাধী নেই। বিজ্ঞ বিচারকেরা এই মানুষগুলিকে দোষী সাব্যস্ত করুন। তাদের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করুন, তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আমাদের সমাজ ও প্রতিষ্ঠান গুলোকে বাঁচান।” ১৯ অগাস্ট ৭ জনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় এবং নিবকে ১৫ বছরের জন্য কারাবাস দেয়া হয়। পৃথিবী জুড়ে এক বিশাল প্রচারণার পর সরকার শোব আর ফিল্ডেনের ফাঁসি মউকুফ করে তাদের যাবৎজীবন কারাদণ্ড দেয়। লিং জল্লাদকে ফাঁকি দিয়ে ফাঁসির আগের রাতে আত্মহত্যা করেন। ১১ নভেম্বর ১৮৮৭ পেরসন্স, এঙ্গেল, স্পিস, ফিসারকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

ক্ষমা
৬লাখ শ্রমিক তাদের সমাধিস্ত করার সময় সমাবেত হয়েছিল। নীব, শোব এবং ফিল্ডেনকে মুক্ত করবার দাবিতে বিদ্রোহ চলছিলোই। ২৬ জুন ১৮৯৩ সালে গভর্নর এ্যাটগেল্ড তাদের মুক্ত করে দেন। তিনি এটা পরিষ্কার করে বলেন যে, তিনি এদের এ জন্য মুক্ত করছেন না যে এরা অনেক শাস্তি ভোগ করে ফেলেছে, বরং এ জন্য যে এদের এতদিন বন্দি করে রাখা হয়েছিল এমন এক অপরাধের জন্য, যা তারা করেননি। তারা এবং যাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছে তারা “উন্মাদ, দূর্নীতিগ্রস্ত বিচারকদের পক্ষপাতিত্বমূলক বিচারের” বলী।
তখনকার কতৃপক্ষ ভেবেছিল যে এ ধরনের শাস্তি ৮ ঘণ্টা আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেবে। পরে অবশ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো যে, বোমাটি হয়তবা কাপ্তান বনফিলদের জন্য কাজ করা এক পুলিশ এজেন্ট ছুড়েছিল কতিপয় স্টিল মালিকের প্ররোচনায়, যাতে করে শ্রমিক আন্দোলন কলুষিত হয়। শাস্তি ঘোষিত হবার পর যখন স্পিসকে আদালতে ডাকা হয়েছিল তখন তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না। “যে আন্দোলনের মাধ্যমে কষ্ট আর চাহিদার বেড়াজালে আড়ষ্ট হয়ে ধুঁকতে থাকা নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষ মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে – যদি মনে করে থাকেন যে আমাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর মাধ্যমে সেই শ্রমিক আন্দোলনকে দাবাতে পারবেন তবে আমাদের ফাঁসি দিয়ে দিন! এখানে আপনারা ফুলকিই সৃষ্টি করতে পারবেন , কিন্তু এখানে ওখানে আপনাদের আগে-পিছে সবখানে আগুন ঝলসে উঠবে। এটা একটা চাপা আগুন যা আপনারা নেভাতে পারবেন না।”

প্রতিবেদকের নোট
ইংরেজী এ্যানার্কিজম শব্দটি বাংলায় রূপান্তর করে আমরা নৈরাজ্যবাদ বলি। নৈরাজ্যবাদ সমাজের যাবতীয় কেন্দ্রিভূত ক্ষমতা-কর্তৃত্ব-আধিপত্যের বিরুদ্ধে সর্বোপরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র-দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তার স্বাধীন-মুক্তশ্রমের মালিকানাহীন-সমাজতান্ত্রিক সমাজের বাসনা নিয়ে। মার্ক্সবাদীরা যেখানে রাষ্ট্র শুকিয়ে মরার তত্ত্ব হাজির করেন, নৈরাজ্যবাদীরা সেখানে রাষ্ট্র বিলোপের সংগ্রামকেই সমাজবাদের সংগ্রামে প্রাথমিক গুরুত্ব দিতে চান। অথচ নৈরাজ্যবাদ শব্দটিকে আমরা প্রায়শই নেতিবাচক অর্থে কেওয়াস-হট্টগোলের সমার্থক বিবেচনা করে ব্যবহার করি। এই ব্যবহার যে খুব সাদামাটা নির্বোধ, তা নয়। নৈরাজ্যবাদী-ধারার সমর্থক মার্কিন-বুদ্ধিজীবী-সক্রিয়ক নোম চমস্কি মনে করেন, শব্দটি মানে ধারণাটি শাসক-শ্রেণীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বলেই এইসব মিথ্যে প্রচারণা এখনও জারি আছে।

 

প্রোব/বান/জাতীয়/৩০-৪-২০১৪

৩০ এপ্রিল ২০১৪ | জাতীয় | ২১:১৫:০০ | ১৬:১৮:১৯

জাতীয়

 >  Last ›