A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে মুখ্য হয়ে উঠেছে জাত-পাতের বিবেচনা | Probe News

westbengal.jpgআলতাফ পারভেজ, প্রোবনিউজ, ঢাকা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রধান তিন শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম ও জাতীয় কংগ্রেস। তবে নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে প্রথম দুই দলের মধ্যে। সিপিএম-এর সাথে শরিক হিসেবে আছে সিপিআই, আরএসপি, ফরোয়াড ব্লক ইত্যাদি দলও। নিজেদের এরা সবাই মার্কসবাদী মনে করে। তৃণমূলের সুনির্দিষ্ট আদর্শ নেই। অতীতে তৃণমূল বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিল। কংগ্রেসের সাথেও দীর্ঘদিন আঁতাত ছিল তাদের। এবার লড়ছে একাই। তবে চমক হিসেবে এবার তারা সিনেমা ও সঙ্গীত জগতের অনেক চরিত্রকে নির্বাচনী ময়দানে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে আছেন মুনমুন সেন, দীপক অধিকারী, শতাব্দি রায় প্রমুখ।

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার আসন ৪২টি। জনমত জরিপ বলছে তৃণমূল ২০-২২টি আসন পাবে, বামপন্থীরা পাবে ১৮-২০টি, বাকি ২-৩টি পাবে জাতীয় কংগ্রেস। জরিপে তৃণমূলকে এগিয়ে থাকতে দেখা গেলেও মাঠের পরিস্থিতি বলছে মার্কসবাদীদের সাথে তাদের ব্যবধান কমে আসবে। তবে সিপিএম, তৃণমূল কিংবা কংগ্রেস-এর মধ্যকার আসন সমীকরণকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী পরিস্থিতির পরিবর্তনশীল চরিত্র বোঝা সহজ নয়। আপাতত ফলাফল যেদিকেই যাক প্রদেশটিতে রাজনীতি মৌলিকভাবেই পাল্টে যাচ্ছে।

অতীতে ভারতীয় এই রাজ্যে সকল দলের রাজনীতিতে কলকাতাকেন্দ্রীক ‘ভদ্রলোক’দের যে আধিপত্য ছিল ক্রমে তা পাল্টে যাচ্ছে। বিস্ময়করভাবে সেখানে নির্ধারক চরিত্র হয়ে উঠেছে জাত-পাতের বিবেচনা যেমনটি এতদিন দেখা যেত উত্তর প্রদেশ, বিহার ইত্যাদি রাজ্যে।

সাধারণভাবে অত্যন্ত রাজনীতি মনস্ক মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নকশাল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। এর মাঝে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনে পুরো রাজ্যে রাজনীতির উপরিকাঠামো পুরোটাই দখল করে ছিল এক ধরনের ‘পার্টি সোসাইটি।’ সিপিএম ও কংগ্রেসের বিপরীতে নবীন তৃণমূল সেখানে পাল্টা ‘পার্টি সোসাইটি’ গড়তে যেয়ে সফল হয়নি। তবে ধীরে ধীরে সে উত্থান ঘটিয়েছে জাত-পাতের রাজনীতি এবং এক্ষেত্রে সে সফলও। ‘পার্টি’র প্রভাব এখন আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির, অন্তত নির্বাচনী রাজনীতির প্রধান চরিত্র নয়। গত বিধানসভা নির্বাচন থেকেই দেখা যাচ্ছে, ভদ্রলোকদের ‘পার্টি সোসাইটি’ তছনছ করে দিচ্ছে বর্ণ, বংশ, জাতের বিবেচনা।

তৃণমূল যখন সিপিএম ও কংগ্রেসের বিপরীতে ‘পাল্টা পার্টি সোসাইটি’ গড়তে ব্যর্থ হয় তখনি তারা এরূপ ‘নিচু জাত’-এর দলগুলোর দিকে হাত বাড়িয়েছিল এবং মেনে নেয় তাদের শর্তহীন আনুগত্য। বিশেষ করে ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে এই ম্যাজিকে ফল পেয়ে তৃণমূল দ্রুত দলিত ও নি¤œবর্গীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে তার সংগঠন বিস্তৃত করতে শুরু করে।

গত নির্বাচনের মতোই এবারও বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত আছে এমন আসনগুলোতে দেখা যাচ্ছে ‘মতুয়া’দের প্রভাব, দার্জিলিংয়ে গুর্খাদের প্রভাব এবং উত্তরবঙ্গের আসনগুলোতে রাজবংশীদের প্রভাব। নির্বাচনী প্রচারণাতেও দেখা যাচ্ছে কে কোন দলের প্রার্থী তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে কে কোন জাতের মানুষ! এর মধ্যে মতুয়াদের সংগঠন ‘মতুয়া মহাসংঘ’-এর উত্থানই সবচেয়ে বিস্ময়কর এক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। মতুয়ারা হলো মূলত পূর্ববঙ্গীয় নিচুজাতের শরণার্থী সমাজ। এদের অনেকেরই পূর্ব পুরুষের বাস বৃহত্তর ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ায়। আধ্যাত্মিকভবে দুই বাংলা জুড়েই এই নি¤œবর্গের যোগসূত্র রয়েছে আজও। বিভিন্ন মেলা ও লগ্নে এসব জাতের সংগঠকদের আসা যাওয়া ঘটে সীমান্তের উভয় পাড়ে।

mamata12.jpg

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র এখন 'বড় মা'। কয়েক কোটি মতুয়া'র ভোট পেতে রাজনীতিবিদরা তাই তাঁর পদধুলি নিতে ছুটে যান।

শত বছর আগে গোপালগঞ্জে হরিচাঁদ ঠাকুরের হাতে গোড়াপত্তন ঘটেছিল যে মতুয়া মহাসংঘের তার আরেক আঞ্চলিক সদর দপ্তর এখন উত্তর ২৪ পরগণায়। হরিচাঁদ ঠাকুরের নাতি প্রমথরঞ্জন ঠাকুন সেখানে ঐ কেন্দ্রটি গড়ে তোলেন। গোপালগঞ্জ এবং ২৪ পরগণা দু’জায়গাতেই বছরের বিভিন্ন সময় লাখ লাখ মতুয়া জড়ো হন বিভিন্ন আরাধনায়। ভারতে এখন প্রায় সাত কোটি মতুয়া রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে তাদের বিপুল এই উপস্থিতি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজরে পড়ে কেবল সম্প্রতি।

বিশেষ করে, ২০০৭-০৮ এ মতুয়া মহাসংঘ প্রথম পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক পরিসরে রাজনৈতিক চরিত্র নিতে শুরু করে। নি¤œবর্গের মতুয়ারা ২০০৯-এর নির্বাচনে ‘ক্ষমতার এক স্থানীয় নেটওয়ার্ক’ প্রদর্শন করে। অতীতে প্রদেশটির সকল দলে কলকাতাকেন্দ্রীক ভদ্রলোকরা যেভাবে পঞ্চায়েত পর্যন্ত রাজ্যের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মতুয়াদের ‘নেটওয়ার্ক’ তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসে এবং তৃণমূলের পক্ষে অনেকগুলো আসনে ফলাফল পাল্টে দেয়। উৎসাহের আতিশর্য্যে মমতা বন্দোপাধ্যায় নিজেকে মতুয়া ধর্মে দীক্ষিত বলেও ঘোষণা করে বসেন!

সাধারণভাবে এক দশক আগেও পশ্চিমবেঙ্গর প্রত্যেক দলের নিয়ন্ত্রক ছিল উচ্চবর্ণীয় ভদ্রলোকরা। মতুয়া, রাজবংশী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বিপুল মানুষ এ রাজ্যে থাকার পরও তারা কোন দলের নীতিনির্ধারক হতে পারেনি। ফলে রাজ্যের রাজনীতিতেও কখনো ‘নিচুজাতে’র স্বার্থের বিবেচনাটি প্রধান হয়ে উঠা সম্ভব ছিল না। ২০১১-১২ থেকে মতুয়াদের সংঘবদ্ধ হওয়া আপার-কাস্টের সেই চির আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

মতুয়া, রাজবংশী প্রভৃতি জাতভিত্তিক গ্রুপগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে এক ধরনের স্বশাসিত চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনরূপ সংঘাতে না যেয়ে নিজেদের বিস্তৃতি নিশ্চিত করেছে। ফল হিসেবে দেখা যায়, ৯৩ বছর বয়সী মতুয়াদের ‘বড় মা’ বীণাপানি দেবি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তার ছোট ছেলে মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুর তৃণমূলের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হলেও ‘ঠাকুর পরিবার’-এর প্রভাব পড়ছে এখন অন্যদলেও। নির্বাচন এলে প্রায় সব দলের বড় নেতারই বড় মা’র ঠাকুর বাড়িতে যান। এবারও তৃণমূল ‘বড় মা’র জ্যেষ্ঠ পুত্র কপিল কৃষ্ণ ঠাকুরকে বনগাঁ থেকে লোকসভার প্রার্থী করেছে। বসে নেই অন্যরাও। বিজেপিও বনগাঁ থেকে প্রার্থী করেছে আরেক মতুয়া নেতা কে ডি বিশ্বাসকে।

মতুয়া ম্যাজিকের পর তৃণমূল হাত বাড়িয়ে দেয় উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের দিকে। রাজবংশিরা দীর্ঘদিনের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। তৃণমূল কুচবিচারে ২০১২ সালে রাজবংশীদের নেতা পঞ্চানন ভর্মার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করে দেয়। এই দেখে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সব দলে রাজবংশী সংগঠকদের কদরও বাড়তে শুরু করে। যে কারণে উত্তরের ডুয়ার্সে প্রার্থী দেখবো আমরা মনোহর তির্কি (আরএসপি), দশরথ তির্কি (তৃণমূল), বীরেন্দ্র ভারা (বিজেপি) প্রমুখকে।

কেবল মতুয়া বা রাজবংশীরাই নয় পশ্চিমবঙ্গের দলিতরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এখন। ২০১২ সালে সেখানে বহুজন মুক্তি পার্টি (বিএমপি) নামে দলিত দলটিরও শাখা গড়ে উঠেছে স্থানীয় পুন্ড্রক্ষত্রিয়, নমশূদ্র ও বাউরিদের নিয়ে। এদের বক্তব্য খুবই ঝাঁঝালো ‘পশ্চিমবঙ্গে বরাবর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে কোন ব্রাহ্মণ বা বৈদ্য; এবার দলিত ও মুসলমানদের এ পদে দেখতে চাই আমরা।’ এবারের নির্বাচনের আগে সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত রাজ্জাকা মোল্লাকে দেখা যাচ্ছে বিএমপি’র সঙ্গে কাজ করতে।

বিএমপি’র এই আওয়াজ এবারই পশ্চিমবঙ্গকে পাল্টে দিতে না পারলেও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক সবাই বলছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মেঠো ভিত্তি দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে।

প্রোব/আপা/পি/ দক্ষিণ-এশিয়া/২৪.০৪.২০১৪

২৪ এপ্রিল ২০১৪ | দক্ষিণ এশিয়া | ১৩:৫২:৩৮ | ১৪:৩২:২৮

দক্ষিণ এশিয়া

 >  Last ›