A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

সাতক্ষীরার পাকিস্তান পাড়া | Probe News

pothe prantore

আনোয়ার পারভেজ হালিম

সাতক্ষীরা তখন উত্তাল। হরতাল অবরোধ ডেকে পুরো জেলা অচল করে দিয়েছে জামায়াত। চলছে যৌথবাহিনীর অভিযান। ঘটনার একটা সরেজমিন প্রতিবেদনের জন্য জানুয়ারির শেষ সপ্তায় আমাদের সাতক্ষীরায় আসা।
শহরের হোটেল টাইগার প্লাস-এ বসে কথা হচ্ছিল স্থানীয় সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে। তাদের একজনের কাছে জানা গেল, কালিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি গ্রামের নাম পাকিস্তান পাড়া। সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয় না। মাঝে-মাঝেই এলাকাবাসী নাকি পাকিস্তানী পতাকা ওড়ায়। অন্য গ্রামের লোকজনের সঙ্গে তারা মেলামেশা করে না।
ওই এলাকাটি এমনিতেই জামায়াত প্রভাবিত। তাদের কথা শুনে গ্রামটি সম্পর্কে আমাদেরও আগ্রহ বাড়ে। খুব সকালে হাড় কাঁপানো শীতকে সঙ্গী করে ভাড়া করা হোন্ডায় আমাদের যাত্রা। গন্তব্য পাকিস্তান পাড়া।
আমাদের হোন্ডার চালক এ নাম শোনেনি আগে। পথচারীদের জিজ্ঞাসা করেও পাকিস্তান পাড়া সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া গেল না। কেউ কেউ পাড়পাড়ায় গিয়ে খোঁজ নেয়ার পরামর্শ দেন। তারা শুনেছেন পাড়পাড়াকেই নাকি পাকিস্তান পাড়া নামে ডাকা হয়।
আমরা কৃষ্ণনগর ও চাচাই গ্রাম পেছনে ফেলে ঘন বাঁশ ঝাড়, সরুপথ পেরিয়ে যখন পাড়পাড়ায় পোঁছাই তখন বেলা আড়াইটা। পুকুর পাড় সংলগ্ন মসজিদের বারান্দায় বসে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন এক বৃদ্ধ। পঁচাশি বছরের এই বৃদ্ধের নাম আব্দুল গফুর। আগে পোস্টমাস্টার ছিলেন, এখন অবসর জীবন। এরমধ্যে সেখানে এসে হাজির হলেন আব্দুল গফুরের ছেলে শহিদুল ইসলাম। পিতার সূত্রে তারও পেশা পোস্ট মাস্টারি। পিতা-পুত্রের কাছে আমরা জানতে চাই পাকিস্তান পাড়ার বৃত্তান্ত।
আব্দুল গফুর জানালেন, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের এই গ্রামটির নাম ভগবান যশোমন্তপুর। সরকারি কাগজপত্রে এখনও এ নামই প্রচলিত। জেলা সদর থেকে গ্রামটির দূরত্ব প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার। কেউ কেউ এ গ্রামকে উত্তর ফতেহপুর নামেও চেনে। গ্রামেরই একটি অংশের নাম ‘পাড় পাড়া’। আব্দুল গফুর জানান, ‘পাড়’ হলো তাদের বংশ পরিচয়।
পাড়পাড়া কীভাবে ঘটনাক্রমে ‘পাকিস্তান পাড়া’ নামে পরিচিতি পেল সেই কাহিনীও শোনালেন এই বৃদ্ধ। তিনি জানালেন, ‘এলাকায় এক সময় প্রচুর হিন্দু পরিবার ছিল। জমিদারও ছিলেন হিন্দু। হিন্দু-মুসলমান সবাই ছিলেন জমিদারের প্রজা। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় জমিদার কলকাতায় চলে যান।’ গফুর জানান, ‘মুসলমানের সংখ্যা ছিল একেবারে হাতে গোনা। তার মধ্যে পাড় পাড়ার বাসিন্দারা আরেকটু আলাদা। এ কারণে সমবয়সী হিন্দু বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলত, তোরা তো সংখ্যালঘু, তোদের পাড়াটার নাম হওয়া উচিৎ পাকিস্তান পাড়া। তবে স্বাধীনতার পর এ নামটা বেশি পরিচিত হয়ে উঠে।’
শহিদুল ইসলাম জানান, ‘এ পাড়ার বাসিন্দারা সবাই ধার্মিক এবং বেশীর ভাগই তাবলীগ জামাতের অনুসারী। জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় অসত্য খবর প্রচার হওয়ায় এ পাড়ার বাসিন্দাদের কেউ ভাল চোখে দেখে না। এর আগে কোন সাংবাদিক এ পাড়ায় এসেছে বলেও জানা নেই তার।’
পাড়ার বাসিন্দারা জানায়, তাদের ছেলেদের মধ্যে কেউ ডাক্তারি, কেউবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছে। কলেজে অধ্যাপনাও করছে কেউ কেউ। কিন্তু এমনই কলঙ্কের তিলক দেয়া হয়েছে যে, বাইরে গিয়ে নিজ গ্রামের পরিচয় দিতেও বিব্রত হতে হয় তাদের। হেয় চোখে দেখা হয় এ পাড়ার বাসিন্দাদের।
এ পাড়ার আরেক বাসিন্দা আব্দুর রহিম বললেন, তার বড় ছেলেটি ঢাকার তিতুমীর কলেজের ছাত্র। সে বাড়িতে খুব একটা আসতে চায় না। কারণ একটাই, গ্রামে এলে নিজেকে সে অসহায় মনে করে সে। প্রতিবেশী সমবয়সী বন্ধুরা সন্দেহের চোখে দেখে। ভাল করে কথাও বলে না।’
আব্দুর রহিম জানান, ‘স্বাধীন দেশে তারা কখনও এ গ্রামে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে দেখেননি।’ ভগবান যশোমন্তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলিপ কুমার জানালেন- ‘তারা নিয়মিত স্কুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে থাকেন।’
পাড়পাড়া বা পাকিস্তান পাড়ার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় এক হাজার। এর মধ্যে ভোটার রয়েছে ৬২৫ জন। এই ভোট নিয়ে রাজনীতি চলে। আশপাশে হিন্দু-মুসলিম, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত নানান মত ও পথের লোকজন বাস করলেও কেবল মিথ্যা প্রচারণার কারণে তাদের থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন পাড়পাড়ার বাসিন্দারা। এ কলংক থেকে মুক্তির উপায়ও জানা নেই তাদের। বৃদ্ধ আব্দুল গফুরের আক্ষেপ- ‘আমরা এ এলাকায় সত্যিই এখন সংখ্যালঘুর মত বেঁচে আছি।’
এবার পাড়পাড়া থেকে ফেরার পালা, কিন্তু মনের খটকা কিছুতে দূর হয়না। শহর থেকে গ্রামটির দূরত্বও বেশি নয়। সাতক্ষীরায় রয়েছে সবকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি, আছে স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকরা। তাহলে সঠিক তথ্য এতদিন আড়ালে থাকলো কী করে, ভুল খবরইবা ছড়িয়ে পড়ল কেন।
সাতক্ষীরা শহর থেকে সোজা দক্ষিণে সুন্দর পর্যন্ত চলে গেলে পাকা সড়ক। এ সড়কের দুই পাশে পূর্ব-পশ্চিমে শত শত একর জমিজুড়ে রয়েছে মাছের ঘের। সড়ক থেকে ভেতরের দিকে প্রায় প্রতিটি গ্রামের দূরত্ব ৩/৪ কিলোমিটারের কম নয়। শহর থেকে যেসব সাংবাদিক খবরের সন্ধানে এদিকটায় আসেন, ২/১ জন ব্যতীত তাদের বেশিরভাগ পাকা সড়কে বসেই তথ্য-তালাশ করে ফিরে যান। গ্রামে ঢোকার কষ্ট করতে চান না, অথবা ভয়ে ওদিকে পা বাড়ান না। কারণ, বেশিরভাগ গ্রামই জামায়াত অধ্যুষিত। জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের উপর নাকি জামায়াতিদের ভীষণ ক্ষোভ। আমরা পাড়পাড়ার শহিদুলের বক্তব্যের সঙ্গে সূত্র মিলাই, এভাবেই খবর আড়ালে চাপা থাকে, নয়তো ভুল খবরের কারণে অনেকের জীবন হয়ে উঠে অতীষ্ঠ। যেমনটি বলছিলেন, বৃদ্ধ আব্দুল গফুর।
এসব তথ্য আমরা জানতে পারি স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার কাছে, পাকা সড়কে তার দোকানে বসে চা খেতে খেতে। শহরে ফিরতে রাত হয়ে যায়। শীতের তীব্রতা প্রচন্ড। ঢাকা থেকে আসা আমার সঙ্গী সাংবাদিকের আব্দার গরম ভাত আর গরুর ভ’না গোশত খাবেন। কিন্তু সাতক্ষীরার সাংবাদিক আমার অনেক দিনের পুরনো বন্ধু সুমন জানালেন, ‘এই শহরের কোন হোটেলেই গরুর গোশত বিক্রি হয় না।’ সে আরেক কাহিনী...।

১১ এপ্রিল ২০১৪ | জাতীয় | ২০:২১:২৩ | ১৩:৪০:২৯

জাতীয়

 >  Last ›