A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

‘ডিজিটাল অর্থনীতি’ গড়তে এবার ইন্টারনেট বিপ্লব জুনাইদ আহমেদ পলক | Probe News

‘ডিজিটাল অর্থনীতি’ গড়তে এবার ইন্টারনেট বিপ্লব

জুনাইদ আহমেদ পলক


বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ঢাকা মানে বাংলাদেশ নয়, ঢাকার বাইরের বাংলাদেশই হলো আসল বাংলাদেশ।’ তাঁর আদর্শকে ধারণ করে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে গ্রাম ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পৃথিবীর সব উন্নত রাষ্ট্র যে পথে হেঁটে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়েছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই গতানুগতিক পথে না হেঁটে, ২০১০ সালে সারা দেশে একযোগে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (শুরুতে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র নাম ছিল) চালু করেন। ফলে আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি বিকাশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অবদান রাখছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো দৃশ্যমান নয়। এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে প্রতিবছরে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ২০ হাজার (প্রতি মাসে ৩৯ লাখ ২০ হাজার) সাধারণ মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি সেবা নিচ্ছে। প্রতি মাসে এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা ৪ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। (সূত্র: ইউআইএসসি সেন্সাস-২০১৩)
তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে একটি জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার আগে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ২৪ লাখ, গত জুলাই মাসে এ সংখ্যা ৫ কোটি ৭ লাখ ৭ হাজার অতিক্রম করেছে। এত দ্রুত ৩২ শতাংশ মানুষকে ইন্টারনেটের ছাতার নিচে নিয়ে আসতে যে মানুষটি সবচেয়ে সচেষ্ট ছিলেন, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তাঁর সুচিন্তিত ও যুগোপযোগী পরামর্শে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্টারনেট বিস্তারে কিছু সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। যেমন বলা যায়: দেশে ইন্টারনেট অবকাঠামো সৃষ্টি, ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে আনতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি, ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়াতে নীতি প্রণয়ন ইত্যাদি। ফলে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, গবেষণা, বিনোদন ইত্যাদিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে, বেড়েছে সার্বিক বাণিজ্যও। তার উদাহরণ আমরা পাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

আমাদের সরকারের ভিশন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। আর জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আগে আমরা গুরুত্ব দিতাম শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে আজ যেমন রোড কানেকটিভিটি দরকার, তেমনি ইনফরমেশন কানেকটিভিটিও দরকার। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহার কোনো বিলাসিতা নয়। সারা বিশ্বে আজ দাবি উঠেছে মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের পর ষষ্ঠ মৌলিক চাহিদা হিসেবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন, বিশ্ব–পরিমণ্ডলে এগিয়ে যেতে হলে এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। আর প্রযুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ইন্টারনেট।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, কোনো দেশে যদি ১০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তৈরি হয় তবে সেই দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি ১.৩ শতাংশ বাড়ে। তাই ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের শ্রমনির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে সবার আগে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনতে হবে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়াতে এবং ইন্টারনেট সম্পর্কে প্রান্তিক পর্যায়ে ধারণা দিতে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আমরা ‘বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক-২০১৫’-এর আয়োজন করেছি। ইন্টারনেট সপ্তাহের প্রথম দুই দিনই (৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর) আমি বনানী মাঠের ইন্টারনেট এক্সপোতে অংশ নিয়েছি এবং দেখেছি সাধারণ মানুষের, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের, ইন্টারনেট ও ইন্টারনেটভিত্তিক নানা ধরনের সেবার প্রতি উদ্দীপনা। এটি যেহেতু ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেটে বিভাগীয় পর্যায়ে এবং সারা দেশের ৪৮৭ উপজেলায় আয়োজন করা হয়েছে, তাই দেশের সর্ববৃহৎ এই ইন্টারনেট উৎসবে সব নাগরিককে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা আসুন, দেখুন, জানুন কীভাবে ইন্টারনেট মানুষের জীবনধারা বদলে দিতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শুধু একটি সাধারণ নির্বাচনী ইশতেহারই নয়, এটি একটি আন্দোলন ও বিপ্লবের দর্শন। এই আন্দোলন হলো সাধারণ মানুষের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পৌঁছে দেওয়া। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা। সমাজের প্রতিটি মানুষকে একজন উন্নত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ—শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, গবেষণা, বিনোদনসহ সব ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রবাসী ছেলেমেয়ে বা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে এখন আর মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। মানুষ আজ অনলাইনে কর দিচ্ছে, ট্রেন-বাসের টিকিট কাটছে, ছাত্রছাত্রীরা তাদের পরীক্ষার আবেদন থেকে শুরু করে ফলাফল পর্যন্ত সবকিছুতে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আমাদের স্থাপিত ৩৫৪৭টি কম্পিউটার ল্যাবে ছাত্রছাত্রীরা প্রযুক্তি শিখছে। ২৩ হাজার ৫০০ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আমরা সারা দেশে আরও দুই হাজার কম্পিউটার ল্যাব কাম ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব স্থাপন করছি, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ থাকছে।

আমি বিশ্বাস করি, মানুষকে দ্রুত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগকে মিলেমিশে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার ব্যবসা করে না, ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অনেক বড় কিছু করা যায়, তার দৃষ্টান্ত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৪। সেবার আমরা বেসিসকে সঙ্গে নিয়ে একটি সফল আয়োজন করেছিলাম। ২০১৫ সালে এসে আমরা সেটিকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছি। তিন দিনে পাঁচ লাখ মানুষ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আয়োজনে এসেছে। আশা করছি, ইন্টারনেট উইকেও আমরা মানুষের সাড়া পাব; সরকার, বেসিস, গ্রামীণফোনসহ দেশের সব খাতের যে যেখানে আছে, তাদের সবার সহযোগিতায় ইন্টারনেট উইকে ১৬ কোটি মানুষকেই সম্পৃক্ত করতে পারব।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৫ কোটি ৭ লাখ ৭ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। এর মাধ্যমে ৭ লাখ মানুষের ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেই হয়, বাংলাদেশে ২০০৮ সালে মাত্র ২৪ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করত এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থান ছিল নগণ্য।

আমরা এখানেই থেমে থাকতে চাই না। ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চাই। এ জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিকে আমরা কানেকটিভিটির আওতায় আনতে চাই। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড কানেকটিভিটি এবং শতভাগ মানুষকে ইন্টারনেট সেবার আওতায় নিয়ে আসা। এগিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সহযোগিতার হাত ধরে আমাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যাবে, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব দেবে, সেই সুদিনের প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে ৯৭ শতাংশ হলো মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ১৮১৩২ সরকারি অফিসকে আমরা ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিয়েছি। ২০১৮ সালের মধ্যে আমাদের সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। অতিসম্প্রতি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে ৫৪৪টি বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এর সুফল পাবে বেসরকারি খাত। তাই বেসরকারি খাতকেই ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে।

দেশে মোবাইল সংযোগ ব্যবহারকারীর সংখ্যা (জুলাই ২০১৫ পর্যন্ত) ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৬৯ হাজার। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হলে এবার আমাদের ‘ইন্টারনেট বিপ্লব’ ঘটাতে হবে। তবেই, গোটা দুনিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটছে তার ভাগীদার হবে বাংলাদেশও। এ জন্য আমাদের ইন্টারনেটে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আমরা যে বিপ্লবের সূচনা করেছি তা এখন ইন্টারনেটেও করতে হবে। এ জন্য শিশু-কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ সবাইকে আমি ইন্টারনেট উইক–২০১৫-এ সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

জুনাইদ আহমেদ পলক: সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ।
minister@ictd.gov.bd

(নিবন্ধটি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত)
প্রোব/পি/আইসিটি/১০.০৯.২০১৫

 

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ | আইসিটি | ১২:৩০:৪৭ | ১৩:২৮:৫৫