A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

রাজধানীর যানজট: সহসাই কমছে না দুর্ভোগ | Probe News

রাজধানীর যানজট: সহসাই কমছে না দুর্ভোগ

শফিক রহমান, প্রোবনিউজ: যানজটের দুর্ভোগ থেকে সহসাই রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। যদিও এ দুর্ভোগ লাঘবের উদ্দেশ্যে ইতঃমধ্যে কয়েকটি ফ্লাই ওভার নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন রয়েছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ। শুরু হয়েছে মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ। কিন্তু এতেও পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হবে বলে মনে করছেন না আরবান ট্রান্সপোর্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঢাকা শহরের গোড়াপত্তনই ঘটেছে অপরিকল্পিতভাবে। সম্প্রসারণও হয়েছে একইভাবে। সেখানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ফ্লাই ওভার, কিংবা একটি মেট্রোরেল দিয়ে পুরো শহরের যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

নগরীর এই যানজটের প্রশ্নে প্রায় সবারই অভিযোগের আঙ্গুলি যানবাহনের সংখ্যার দিকে। বিশেষ করে প্রাইভেট কারের দিকে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসাব মতে, বর্তমানে সারা দেশে মোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪০টি। এর মধ্যে ঢাকা শহরের মোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৮ লাখ ৭০ হাজার ৮৭১টি। বিআরটিএ’র দেয়া সাম্প্রতিককালের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায় গত চার বছরে ঢাকা শহরের রাস্তায় যোগ হয়েছে তিন লাখ ৫৩ হাজার ৯৫০টি গাড়ি।

এর মধ্যে ২০১৪ সালে নগরীতে যুক্ত হয়েছে মোট ৭৩ হাজার ৫১ গাড়ি। এর মধ্যে প্রাইভেট কার রয়েছে ১২ হাজার ৯৭২টি, বাস এক হাজার ৩৬৪টি, মিনিবাস ১৩৫টি, মাইক্রোবাস তিন হাজার ৮৪২টি, এ্যাম্বুলেন্স ২৫৪টি, অটোরিকশা ৫৬টি, কার্গো ভ্যান ৬০৩টি, কাভার্ড ভ্যান দুই হাজার ৩৫২টি, হিউম্যান হলার ১০৯টি, জিপ এক হাজার ৫৮২টি, পিকআপ সাত হাজার ২৯৫টি এবং পাঁচ হাজার ৭৬৭টি ট্রাকসহ রয়েছে অন্যান্য যানবাহন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সংখ্যক যানবাহন যানজটের একমাত্র কারণ নয়। তাদের মতে, সমস্যার মূলে রয়েছে সড়কের অপর্যাপ্ততা। এ প্রসঙ্গে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট অথরিটির উপদেষ্টা (ইনস্টিটিউশনাল সাপোর্ট এন্ড লিংকেজ) প্রকৌশলী এ টি এম হেলালউদ্দিন নাগরী প্রোবকে বলেন, ‘একটি আধুনিক শহরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা। অথচ, ঢাকা শহরে রাস্তা রয়েছে মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ’।

এছাড়া, শহরের বিরাজমান সড়ক নেটওয়ার্ক বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি মেনে গড়ে উঠেনি বলেও অভিযোগ করেন হেলাল উদ্দিন নাগরী। তার মতে, ‘চার শ’ বছরের পুরনো এই শহরের সবচেয়ে বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটেছে উত্তর-দক্ষিণ মুখী। সড়ক নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে উত্তর-দক্ষিণমুখী হয়ে। পূর্ব-পশ্চিমমুখী কানেকটিভিটি কম। তাই শহরের যানজট নিরসনে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পূর্ব-পশ্চিমমুখী কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর যানজটের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত এই দুর্বলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাও কোন অংশে কম দায়ী নয়। আজও ঢাকা মহানগরীতে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তনে কার্যকরী কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি। বরং দেখা যাচ্ছে, এখনও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু কাজ করছে ঢাকা সিটি করপোরেশন, কিছু কাজ করছে রাজউক, বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

অথচ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামো উইং -এর উদ্যোগে ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল মেয়াদে ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্ট্যাডিজ (ডিআইটিএস) শীর্ষক একটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন ও পরিবহন সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান সমূহের সর্বোচ্চ সমন্বয় সাধনের জন্যে একটি বোর্ড প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছিল। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন সাপেক্ষে গঠিত হয় গ্রেটার ঢাকা ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং এন্ড কোঅর্ডিনেশন বোর্ড (জিডিটিপিসিবি)। পরে ২০০১ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে বোর্ডের নামকরণ করা হয় ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন বোর্ড (ডিটিসিবি)। বর্তমানে যা ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি নামে পরিচিত।
বলা হয়েছিল এই বোর্ড ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় শহরের রাস্তাঘাট উন্নয়ন, সিগন্যাল বাতি স্থাপন, ডিএমপি’র ট্রাফিক ডিভিশনের জন্য যন্ত্রপাতি এবং যানবাহন সরবরাহ, বিআরটিএ’র আধুনিকায়নসহ ডাটাবেজ স্থাপন করবে। দেড় দশকেও ডিটিসিএ এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ হোসেন বলেন, নীতি পরিকল্পনায় অনেক ঘাটতি আছে। এর চেয়েও বড় ঘাটতি রয়েছে জনবলে।

এদিকে, ২০০৪ সালে স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান (এসটিপি) শীর্ষক ২০ বছর মেয়াদী একটি মহা-পরিকল্পনা হাতে নেয় ডিটিসিবি। ওই মহা-পরিকল্পনায় ঢাকা শহরের যানজট নিরসনসহ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ছয়টি মেগা প্রকল্পসহ মোট ৭৪টি প্রকল্পের সুপারিশ করা হয়েছিল। ছয়টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে তিনটি ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট (এমআরটি) লাইন, অথবা মেট্রোরেল এবং তিনটি বাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট (বিআরটি) লাইন। কিন্তু এই মহা-পরিকল্পনা বাস্তবায়নতো দূরের কথা অনুমোদন পেতেই সময় লেগেছে চার বছর। অর্থাৎ, ২০০৮ সালে সরকারের অনুমোদন পায় এসটিপি।

মো. কায়কোবাদ হোসেন জানান, এসটিপি’র আওতায় ইতিমধ্যে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে এমআরটি-৬ লাইন বা মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে। ২০২০ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে উত্তরা থার্ড ফেইজ থেকে মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়া পাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ হয়ে মতিঝিল পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র ৩৭ মিনিট। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা।

এছাড়াও, এসটিপি’র আওতায় বিআরটি-৩ লাইন (বাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট) নির্মাণ প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২০ সাল নাগাদ গাজীপুর থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট হয়ে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প পর্যন্ত এ লাইন নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮০ মিলিয়ন ডলার।
তবে ২০২০ নাদাগ এই প্রকল্প দুটির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেও যানজটের জনদুর্ভোগ থেকে নগরবাসীর রেহাই মিলছে না বলে মনে করছেন কায়কোবাদ হোসেন। তিনি বলেন, একটি শহরের লোক সংখ্যা ১১ লাখে পৌঁছলেই ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু করতে হয়। সে হিসাবে ১৯০৬ সালে ঢাকা শহরের লোক সংখ্যা ছিল ১১ লাখ এবং তখনই ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালু করার কথা ছিল। এর পরে ১৯৭৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার। ২০১১ সালে ছিল এক কোটি ৫০ লাখ। বর্তমানে অনুমান করা হচ্ছে এক কোটি ৭০ লাখ। শুধু জনসংখ্যার হিসাবে হলেও ঢাকা শহরে বর্তমানে ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট থাকা উচিত ১৭টি। সেখানে আমরা কেবল একটি নির্মাণ করতে যাচ্ছি। এবং এই একটি দিয়েই পরিবহন ব্যবস্থার আমূল উন্নতি ঘটবে তা আশা করাও ঠিক নয়।
তিনি আরো জানান, ২০২৫ সাল নাগাদ শহরের জনসংখ্যা দাঁড়াবে দুই কোটি ২৩ লাখে এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়াবে দুই কোটি ৬৩ লাখে।
এসটিপি’তে উল্লেখ করা বাকি প্রকল্পের বিষয়ে কায়কোবাদ জানান, এসটিপি পুনঃমূল্যায়নে কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে আগামী ২০ বছর মেয়াদী অর্থাৎ ২০৩৫ সাল নাগাদ একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হবে। তার ভিত্তিতেই আগামী দিনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক তানভীর হাসান বলেন, ঢাকা শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হলো অধিক জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যার অধিকাংশই আবার ওয়ার্কিং ক্লাসের। ফলে তাদের চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বেশি। দৈনিক গড় ট্রিপ সংখ্যাও বেশি। কিন্তু তাদেরকে সেই পরিমাণ সুযোগ দেয়ার সক্ষমতা এই শহরের নেই।

আবার চাইলেও ক্যাপাসিটি বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, শুরু থেকেই শহরটি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এর সম্প্রসারণও হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে পরিবহন ক্যাপাসিটি বাড়াতে হলে যে পরিমাণ জায়গা দরকার তা আর বেড় করা সম্ভব নয়।

তাই নগরীর যানজট নিরসনসহ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে রাস্তা বাড়ানো, ফ্লাই ওভার বানানোর মতো সাপ্লাই সাইড নিয়ে চিন্তা করলেই হবে না। বরং ডিমান্ড সাইড নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে মত দেন অধ্যাপক তানভীর হাসান। তিনি বলেন, এখন সবাই ঢাকামুখী। সকলের ধারণা ঢাকায় আসলেই কিছু একটা হবে। কিন্তু এভাবে সারা দেশের সবাইকে কি ঢাকায় স্থান দেয়া সম্ভব? কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই যদি হয় তাহলে আরো অনেক আগেই আমাদের ডিমান্ড সাইড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিন্তা করা উচিত ছিল। কিন্তু আজও আমরা সেই চিন্তা করছি না। সবাই বলছি রাস্তা বাড়াতে হবে, ফ্লাই ওভার বাড়াতে হবে। সেটা কতটা পর্যন্ত সম্ভব তা আর ভাবছি না।

ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে ডিসেন্ট্রালাইজেশনের দিকেই যেতে হবে। এর জন্যে সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতি ও পরিকল্পনায় সহযোগিতা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এক নজরে ঢাকা
* শহরের মোট জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ
* দিনে পরিবার প্রতি গড় ট্রিপ ৮.৫টি
* দিনে মোট ট্রিপ দুই কোটি আট লাখবার
* ট্রিপের গড় দুরত্ব ৫.৪ কিলোমিটার

নগরীর যানজটের কারণ
* চারশত বছরের পুরান ঢাকা মহানগরীরর উত্তর-দক্ষিণে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রধান চারটি রাস্তাই উত্তর-দক্ষিণে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু পূর্ব-পশ্চিমে কানেকটিভিটি গড়ে উঠেনি।
* একটি আধুনিক শহর হিসেবে যেখানে ২৫% রাস্তা থাকা দরকার সেখানে ঢাকা শহরে রাস্তার পরিমান মাত্র ৭%।
* অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ভূমির যথাযথ ব্যবহার না হওয়া।
* পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব
* স্বল্প ও দ্রুত গতির মিশ্র বাহন।

প্রোব/পি/শর/জাতীয়/পিএস/২৩.০৫.২০১৫

২৩ মে ২০১৫ | জাতীয় | ১৭:৩২:৪৯ | ১০:৪৪:৪৫

জাতীয়

 >  Last ›