A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Only variable references should be returned by reference

Filename: core/Common.php

Line Number: 257

গুজরাট ‘নিরীক্ষা’ ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ধারাবাহিকতা | Probe News

mks.JPGপূর্ববর্তী কিস্তিগুলোতে ভারতে মুসলমানদের বহুমুখী দুরবস্থার সংক্ষিপ্ত একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটিকে যে সেখানকার ২-১টি প্রদেশের সাধারণ কোনো প্রশাসনিক বঞ্চনা বা শাসন সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে সেখানে মুসলমানদের প্রতি আর্থসামাজিক বঞ্চনার গভীরতর দার্শনিক, ধর্মীয় তথা মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে এবং লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এর ওপর ভর করে রাজনৈতিক সফলতা পাচ্ছে বিভিন্ন দল। বলাবাহুল্য, বিজেপি এক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে এবং মোদির উত্থান এর চমকপ্রদ এক প্রকাশ।
কেবল মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার প্রচার ও প্রসারই নয় সংকীর্ণ এক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উম্মাদনাকে পুঁজি করে সর্বভারতীয় অর্থে বিজেপি এখন সে দেশের সবচেয়ে বড় দল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, এই দলের আদর্শ হলো ‘হিন্দুত্ব’ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ। এই পর্যায়ে আমরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীর মর্মবাণীটি বোঝার চেষ্টা করবো। এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে নিম্নক্ত লেখাটি রয়েছে বিজেপির ওয়েব সাইটে : ‘Hindutva-The Great Nationalist Ideology’.
আজকের ভারতকে বোঝার জন্য এ লেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মাধ্যম। এটিকে অনেকটা বিজেপির অফিশিয়াল ভাষ্য বলা যায়। এতে পুরো ভারতের শাসক শ্রেণীর চিন্তার মূল খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ লেখাটি ভিত্তি হিসেবে ধরেই আমরা সমকালীন ভারতে মুসলমানদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আচরণের মৌলিক ভিত্তিটি বোঝার চেষ্টা করতে পারি। ২ হাজার ৩৮০ শব্দের উপরোক্ত লেখায় বিজেপি নিম্নক্ত অনুসিদ্ধান্তগুলো হাজির করে
ক. ভারতে মুসলমানরা হলো ‘আগ্রাসী শক্তি’। ভারত হলো হিন্দুদের দেশ (Motherland of hindus)। ভারতকে ‘হিন্দুস্থান’ নামে অভিহিত করতেই বিজেপি অধিক আগ্রহী। এই হিন্দুস্থানের সীমানা বিজেপি মনে করে আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পুরো ভূখ-ণ্ডে মুসলমানরা হলো বিজেপির কাছে Invader. যেহেতু মুসলমানরা হলো বিদেশি আগ্রাসী শক্তি, সেহেতু স্বাধীন হিন্দুস্থানে ওই আগ্রাসী শক্তির কোনো সাংস্কৃতিক চিহ্ন থাকতে পারে না। ইসলামের সব সাংস্কৃতিক চিহ্নই এখানে ‘আগ্রাসী শক্তির বিদেশি ধ্যান-ধারণা’। ফলে এটি উপড়ে ফেলতে হবে। এখানে প্রার্থনাস্থল থাকবে কেবল মন্দির, ধর্মগ্রন্থ থাকবে কেবল গীতা ও বেদ, সাহিত্য থাকবে কেবল রামায়ণ ও মহাভারত। এখানে (স্বাধীন হিন্দুস্থান) উপাসনাযোগ্য ব্যক্তি হবেন রাম, কৃষ্ণ, শকরাচার্য, তুলসীদাস, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। এসবই হবে বিজেপির মতে ভারতের বাসিন্দাদের ‘Guiding principles.’
খ. বিজেপি মনে করে, জার্মানিতে যেভাবে ইহুদিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন হয়েছে, ভারতেও অতীতে মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর সেভাবে নিপীড়ন চালিয়েছে। তারা হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তকরণ করেছে। মুসলমানরা এবং তাদের যাবৎ ধর্মীয় স্থাপনা হলো আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক। এখন যেহেতু দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেহেতু নিপীড়কদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার সময় হয়েছে। ভারতীয়দের জন্য এগুলো হলো Marks of cruel slavery. সুতরাং এগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হবে। এটিকে বিজেপি বলছে, ‘হিন্দু জাগৃতি’ তথা Mentel freedom । ওই ‘হিন্দু জাগৃতি’র আলোকেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দার্শনিক কারণ ব্যাখ্যা করে বিজেপি উল্লিখিত লেখায় স্পষ্টই বলেছে

এটিকে (অযোধ্যার মসজিদ) বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে এবং তা অন্যত্র সরানো বা এর ধ্বংস সাধন করে সেখানে রামের নামে একটি মন্দির নির্মাণের মাধ্যমেই কেবল ভারত তার স্বাধীনতা হাসিল করতে পারতো। এই সংঘাতকে কেবল আরেকটি মন্দির নির্মাণের চেষ্টা হিসেবে ভাবনাটা হলো ভুল। ভারতে অন্যত্র যে কোনো স্থানেই আরেকটি মন্দির নির্মাণ করা যেতো। কিন্তু এর সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্ন এতো ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল না যেমনটি ছিল রাম জন্মভূমির সঙ্গে। এই ন্যায্য দাবির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রশ্ন। ওই বৌদ্ধিকModi 122.jpg দাসত্বের খবরদারিত্বে ভুগছে ভারত দীর্ঘদিন। প্রাচীনকাল থেকে হিন্দুস্থানের সর্বত্তোম নমস্য হলেন রাম। অযোধ্যার সংঘাতে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত যদি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, তাহলে প্রমাণিত হতো ধর্ম-বর্ণ ও ভাষা-লিঙ্গভেদে তাদের সর্বোত্তম নমস্যকে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, জানাতে পারছে। এর মানে অযোধ্যার অবকাঠামোটি (মসজিদ) গুঁড়িয়ে দেয়ার মানেই ছিল অবদমিত ইতিহাসের মুক্তি। ওই অবদমিত ইতিহাস ভারতীয়দের সঙ্গে মানানসই ছিল না। এই ইতিহাস হলো হাজার বছরের ক্ষোভ ও পুঞ্জীভূত লজ্জার ইতিহাস। তথাকথিত বাবরি মসজিদের প্রথম ইটটি খসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই ইতিহাসের স্বতঃস্ফূর্ত অবমুক্তি ঘটে গেছে। এর মধ্য দিয়ে হিন্দুধর্মের ওই ধারণাটিরই বিজয় হলো ‘আমিই সঠিক।’

উপরোক্ত বয়ানে ভারতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত অনুসরণের মাধ্যমে সৃষ্ট সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বিজেপি বলেছে, ভারতে হিন্দুত্বের আদর্শ ইসরায়েল রাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করছে। ওই দেশটির সফলতা এখানেও কায়েম করতে পেরেছে অর্থাৎ ইসরায়েল যেভাবে স্থায়ী নিষ্ঠুরতার নীতির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সদম্ভ অবস্থান বজায় রাখছে, বিজেপি মনে করেÑ ভারতকেও তারা সেভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে।
উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই বিজেপি এখন প্রায় পুরো ভারতের প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক মসজিদ উচ্ছেদের দাবি জানাচ্ছে। তাদের কাছে এটি ‘স্বাধীনতা’কে অর্থবহ ও ‘সেক্যুলারিজম’ কায়েম করার ব্যাপার। বিজেপি মনে করে, সেক্যুলারিজম মানে বহুমুখী সংস্কৃতির নামে আপস নয়, বরং সেক্যুলারিজমের সঠিক অর্থ হতে হবে হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে অন্যসব সংস্কৃতির তরফ থেকে আপস। বিজেপির কাছে ‘হিন্দুত্ববাদ’ই হলো সেক্যুলারিজম। এটি একই সঙ্গে একটা ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’ও বটে (A new world order)।
সেক্যুলারিজমের উপরোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বিজেপি মনে করে, হিন্দুরা হলো সহনশীলতার প্রতীক। প্রচুর নিপীড়নের পরও তারা সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মুসলমানরা কখনোই তাদের মনোভাব পরিবর্তন করেনি। জন্মগতভাবেই তারা পরিবর্তনে অক্ষম। সুতরাং হিন্দুস্থানে সেক্যুলারিজমের বিপদ আসছে মূলত মুসলমানদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। মুসলমানদের কারণেই ভারত ভেঙেছে। তারা ভারত ভাঙার জন্য দায়ী। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সেখানে মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করলেও ভারতে হিন্দুরা মুসলমানদের ওপর তা করেনি। হিন্দুরা তাদের সেক্যুালারিজমের আদর্শই অনুসরণ করছে।
বলাবাহুল্য, এই ‘সেক্যুলারিজম’ ভারতে মুসলমানদের উপহার দিয়েছে বঞ্চনাদগ্ধ এক জীবন। কেবল নিপীড়ন বা হত্যার হুমকিই নয়, মানসিকভাবেও সার্বক্ষণিক পীড়নের মধ্যে রাখা হয় তাদের। আরএসএস, বিজেপি ও সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনের তরফ থেকে প্রতিনিয়ত মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো, মুসলমানদের কটাক্ষ করা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো ইত্যাদি চলতে থাকে। যেমন গুজরাটের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি হামেশা এমন একটি পোস্টার ছাপেÑ যেখানে মোদির ছবি ও পাকিস্তানের মানচিত্র দিয়ে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়, ‘আসন্ন নির্বাচনে আপনি কাকে ভোট দেবেন?’ আবার নির্বাচনী জনসভায় হিন্দুদের আমোদিত করার জন্য মুসলমানদের নিয়ে অপমানকর কটাক্ষ করা হয়। যেমন গুজরাট দাঙ্গার পর সেখানে হাজারো মুসলমানের ঠাঁই হয় রিলিফ ক্যাম্প বা লঙ্গরখানায়। মোদি এক পর্যায়ে এসব লঙ্গরখানার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে থাকেন এভাবে যে ‘এগুলো প্রজননকেন্দ্র ছাড়া আর কিছু নয়।’
মোদির এসব বক্তব্য ও গুজরাটে মুসলমান নিধন পুরো ভারতে হিন্দু সমাজে তার ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল করেছে। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ বলতে থাকেন, ‘He (Narendra Modi) has salvaged the party's credidility and honour in a way no one has done after we cene to power in the Centre.’
মোদির প্রশংসার পাশাপাশি এ সময় মুসলমানদের প্রতি সমানভাবে হুমকি ও কটাক্ষও বর্ষণ চলছিল এবং চলছে। গুজরাট গণহত্যার পরই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সভাপতি অশোক সিংগাল বলেন, ‘গুজরাটের নিরীক্ষাটি সফল। ২০০২ সালের ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি আমরা ৫০ লাখ হিন্দুকে রাস্তায় নামাতে পেরেছিলাম। প্রয়োজনে এই মডেলের পরীক্ষা দেশের অন্যত্রও চালানো হবে।’ হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্পাদক প্রবীণ ভাই তোগাড়িয়া এরূপ ‘পরীক্ষা’ ভারতের বাইরেও করার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

গুজরাট ‘নিরীক্ষা’ ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ধারাবাহিকতা
সংঘ পরিবারের নেতৃবৃন্দ গুজরাটের গণহত্যাকে একটি নিরীক্ষা বা পরীক্ষা যাই বলুক না কেন, বাস্তবে তা ২০০২ সালে শুরু হয়নি বরং এর সমকালীন প্রকাশ আরও এক দশক আগে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অযোধ্যাকা-ের মধ্য দিয়ে। আরএসএস বা সংঘ পরিবার বা ‘সেক্যুলার’ ভারতের সাম্প্রদায়িকস্বরূপ সম্পর্কিত যে কোনো আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায় ভারত রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ওই দিনের বিবরণ ছাড়া। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ১৫২৮ সালে মোগল সেনাপতি মীর বণিক নির্মিত ওই মসজিদটি সম্রাট বাবরের নামে উৎসর্গকৃত ছিল এবং বরাবরই তা ভারতের অন্যতম মুসলিম স্থাপত্যকর্ম হিসেবেও স্বীকৃত হতো। ১৯৮০ সালের পর থেকে সংঘ পরিবার রাজনীতিতে নিজেদের অগ্রগতির অস্ত্র হিসেবে দাবি করতে শুরু করে যে, এই মসজিদের স্থলে একটি মন্দির নির্মাণ করতে হবে। কারণ উল্লিখিত মসজিদটি নির্মাণের আগে এখানে একটি মন্দির ছিল। হিন্দুদের সহানুভূতি আদায়ের জন্য তারা দাবিকৃত মন্দিরের নাম দেয় ‘রাম মন্দির’। প্রাসঙ্গিক কোনো গবেষণা তথ্য দ্বারা রাম মন্দিরের ঐতিহাসিক বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও ১৯৯০ সালের দিকে রাম মন্দির ইস্যুতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ধর্মীয় ‘রথযাত্রা’র আয়োজন করে এটিকে একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় দাবিতে পরিণত করেন আদভানি ও মুরালি মনোহর যোশি। এক পর্যায়ে সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনের সহায়তায় তারা উস্কানিমূলকভাবে ঘোষণা দেন, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ এলাকায় তারা দাবিকৃত মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এ লক্ষ্যে তারা ওই দিন কয়েক লাখ করসেবকের (হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক) সমাবেশ ঘটান বাবরি মসজিদ এলাকায় এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সামনেই পুরো মসজিদটির ধ্বংস সাধন করে উম্মত্ত করসেবকরা। আদভানিসহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ওই ঘটনার সময় অত্র এলাকায়ই ছিলেন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নীরবে নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ধ্বংসলীলার দর্শক হিসেবে। তবে মসজিদ ধ্বংসের পর পরই ভারতজুড়ে যখন মুসলমানদের বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন এসব বাহিনী আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রায় দুই হাজার মুসলমান নিহত হয় বিভিন্ন শহরে।
‘আইবি’ নামে সুপরিচিত ভারতের অন্যতম গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর যুগ্ম-পরিচালক মলয় কৃষ্ণ ধর পরবর্তীকালে দাবি করেছেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বিষয়টি মোটেই স্বতঃস্ফূর্ত কোনো ব্যাপার ছিল না এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারেরও তা অজানা ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইবির পক্ষ থেকে সংঘ পরিবারের এ সংক্রান্ত তৎপরতায় তিনিই নজরদারি করতেন এবং অন্তত ১০ মাস আগে আরএসএসের সব অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যে বৈঠকে মসজিদ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, সে আলোচনার গোপন টেপ তিনি নিজে আইবিতে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিয়েছিলেন। এমন স্পর্শকাতর তথ্য যে আইবির পরিচালকরা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন, সে বিষয়েও তিনি নিঃসন্দিগ্ধ।
উল্লেখ্য, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ছিল নরসিমা রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। আর উত্তর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কোনো তরফ থেকেই করসেবকদের আক্রমণ থেকে মসজিদকে রক্ষায় তৎপরতা দেখা যায়নি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ঘিরে সেক্যুলারিজমের যে মিথ ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এ সময়। ফলে বিজেপি ও সংঘ পরিবারের উত্থানে তা বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। ভারতীয় মিডিয়ায় সে সময় এমনও সংবাদ প্রকাশিত হয়, মসজিদ ধ্বংসকালীন কয়েক ঘণ্টা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেকে সব যোগাযোগের বাইরে রাখেন। ঘটনার ১০ দিন পর বিশ্বজুড়ে ধিক্কারের মুখে ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমএস লিবারহানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে ঘটনার তদন্ত করার জন্য। বিস্ময়কর হলেও এটিই সত্য, ‘১৬ বছর’ পর ওই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করে ২০০৯ সালের ৩০ জুন। তদন্তের এ দীর্ঘসূত্রতাই প্রমাণ করে, ভারতের শাসক শ্রেণী বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় কংগ্রেস-বিজেপি নির্বিশেষে পরস্পর কীভাবে নীরব সম্মতিতে এসেছিল। এও উল্লেখ্য, গুজরাট গণহত্যা শেষে নরেন্দ্র মোদি যেমন নিন্দার পরিবর্তে আবার প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তেমনি উত্তর প্রদেশেও কল্যাণ সিং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কর্তৃত্বে ১৯৯৭ সালে আবারও প্রদেশটিতে মুখ্যমন্ত্রী হন।

পরবর্তী কিস্তি: মোদির প্রতি ইউরোপ-আমেরিকার মনোভাব পাল্টাচ্ছে

প্রোব/আপা/কলাম/০৫.০৪.২০১৪

৫ এপ্রিল ২০১৪ | বিবিধ ১ | ২০:৪০:১৪ | ২০:৫৫:৩৪